দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন পাট কাটার মৌসুম। ভালো ফলন, ন্যায্য দাম ও পাটের বহুমুখী পন্য ব্যবহার বৃদ্ধিতে পাট খাতে সতুন সম্ভাবনা তেরি হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নাটোর জেলায় পাট চাষে কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন। এতে করে জেলায় সোনালী আঁশের দিন ফিরে আসছে।
বিগত সময়ে পাটের উচ্চ মূল্যের কারণে কৃষকরা পাট চাষে ক্রমশ: আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। নাটোরে বেড়েছে পাটের আবাদি জমি এবং উৎপাদনের পরিমাণ। জমিতে সবুজে ভরপুর পাট রাজ্যে চলছে পাট কাটা।
অন্যদিকে, জলাশয় ও এর পাড় সংলগ্ন স্থানগুলোতে পাট গাছ ভেজানো, পাটের আঁশ ছড়ানো, পাট শুকানো এবং পাটকাঠি সংগ্রহসহ সকল কর্মযজ্ঞই চলছে যুগপৎভাবে। সবুজ পাট গাছের রূপান্তর ঘটছে সাদা পাট আর পাটকাঠিতে। রূপালী রৌদ্রকে মেঘে ঢেকে দিয়ে প্রকৃতিতে নামছে শ্রাবণ ধারা। প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে গ্রামীণ জনপদে কৃষকদের এখন চলছে পাট উৎসব।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের আবাদ হয়েছে। ৩০ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৬ হেক্টর। বিগত এক যুগ আগে জেলায় পাটের আবাদি জমি ছিল চলতি বছরের প্রায় অর্ধেক। পাটের আবাদি জমি বিগত সময়ে ক্রমশ বেড়েছে। অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় আবাদি জমির পাশাপাশি হেক্টর প্রতি পাটের গড় উৎপাদনও বেড়েছে। ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির পাট কাটা হয়েছে। মোট উৎপাদন ৩০ হাজার ৯৯০ টন।
সিংড়া উপজেলার সাঁঐল এবং লাড়ুয়া গ্রামের কয়েক কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশ এবং সংলগ্ন বিল ও ডোবাতে শতাধিক নারী-পুরুষ পাট পঁচানো ও আঁশ ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এ কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মত। তারা মূলতঃ পানিতে না নেমেই জলাশয়ের পাড়ে তোলা পঁচানো পাটের আঁশ ছড়াচ্ছেন।
আঁশ ছড়ানো কাজে নিয়োজিত ভানু বেওয়া বলেন, আমি পাট কাঠি নেয়ার শর্তে আঁশ ছড়ানোর কাজ করছি। হাতিয়ানদহের গদাই নদীতে নেমে আঁশ ছড়ানো হারেস মিয়া জানান, আমরা ১০জন কাজ করছি। প্রতিদিন জনপ্রতি ৭০০ টাকা মজুরি। আবার অনেকেই আটি প্রতি সাড়ে চার টাকা দরে কাজ করছে।
নদীর পাড়ে আঁশ ছড়ানোর কাজ করছেন আরো ১০ জন মহিলা। মিনতি রানী জানান, আমরা সবাই পাটকাঠি নেয়ার শর্তেই কাজ করছি। আবার অনেক কৃষকের পরিবারের নারী সদস্যরাও তাদের নদী সংলগ্ন বাড়ির আঙিণায় পাটের আঁশ ছড়াচ্ছেন।
মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী হাফসা জানান, স্কুল ছুটির দিন, তাই বাড়ির সবাই মিলে পাটের আঁশ ছড়াচ্ছি। নিজের বাড়ির কাজ নিজেরাই করছি। অনেক ভালোলাগা কাজ করছে।
রাস্তার দু’ধারে বাঁশের আড় টানিয়ে, কালভার্টের রেলিং কিংবা গৃহস্থ্য বাড়ির চারপাশ-সর্বত্রই চলছে পাট শুকানোর কাজ। এসব এলাকা জুড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে পাটকাঠির বোঝা সমৃদ্ধির জানান দিচ্ছে।
লাড়ুয়া এলাকার কৃষক রমিজুল বরাবরের মত এবারো তার দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। লাড়ুয়া বিলে পাট ছড়ানো শ্রমিকদের কাজ তদারককারী রমিজুল বলেন, এবার আষাঢ়-শ্রাবনে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। হাতের নাগালে আশপাশের সকল জলাধার পানিতে টইটুম্বুর থাকায় জমির পাট অনায়াসে পঁচাতে পারছি, পরিবহনের খরচ নেই। তবে বৃষ্টি বেশি, রোদ কম হওয়াতে পাট শুকানোতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় শুকাতে দেওয়া পাট আবার বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে।
নাটোর সদর উপজেলার হয়বতপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, এবার এলাকায় আশানুরূপ পাট চাষ হয়েছে। গড় উৎপাদন বিঘা প্রতি ৯ মণ।
রাজাপুর কৃষি ব্লকের জাঠিয়ান এলাকার কৃষক জুবায়ের হোসেন এবার সাত বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি জানান, পাট কাটা শুরু হয়েছে। আশাকরি বিঘায় ১০ মণ ফলন পাবো।
নলডাঙ্গা উপজেলার বাঁশিলা গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, জমিতে গম বা ডাল উঠে যাওয়ার পর আমন মৌসুমের আগে পাট চাষ করা হলে জমি অনাবাদি থাকে না। চৈত্র মাসের মধ্যে পাট বীজ বোনা হলে আগাম পাট কেটে খুব সহজেই আমন মৌসুম ধরা যায়।
নাটোরের আদর্শ কৃষক হাসান আলী বলেন, গত কয়েক বছরে কৃষকদের মাঝে পাট চাষে বেশ ভাল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পাট বাজারের সম্প্রসারণ ঘটছে। এর ফলে দরও ভাল পাওয়া যাচ্ছে।
সরেজমিনে নাটোরের প্রসিদ্ধ পাটের হাট গুরুদাসপুরের নাজিরপুর, নাটোর সদরের তেবাড়িয়া এবং সিংড়ার হাতিয়ান্দহ হাট ঘুরে দেখা যায়, আগাম ওঠা পাট হাটে কেনাবেচা শুরু হয়েছে।
হাতিয়ান্দহ হাটে পাট বিক্রি করতে আসা ফিরোজ আলী বলেন, হাটে সাড়ে ৩ হাজার টাকা মণ দরে জমির পাট বিক্রি করলাম।
দীর্ঘদিন ধরে করা পাট ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম মেম্বর জানান, আশাকরি পাটের দর ব্যবসায়ী ও কৃষক-উভয়ের জন্যই ভাল হবে। বর্তমানে পাটের দর ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সামনে আরো দাম বাড়বে বলে মনে হয়। এবার পাটের বিপণন কার্যক্রম জমজমাট।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান জানান, আমাদের উপজেলায় বর্তমানে পাটের গড় উৎপাদন বিঘা প্রতি সাড়ে সাড়ে ৮ মণ, তবে গড় উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অদিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বাসস’কে বলেন, চলতি মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেয়ার জন্যে সহায়ক হয়েছে। পরিবেশ বান্ধব বলেই পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশে ও বিদেশে পাটের চাহিদা বাড়ছে।
তিনি বলেন, বাড়তি মূল্য পাওয়ার কারণে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন, পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তাদেরকে প্রণোদনাও প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি জ্ঞানে কৃষকদের এগিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে থাকছে।
সূত্রঃ বাসস



















