দামি জুতা ও পেশাদার পোশাকে সজ্জিত প্রতিযোগীদের ভিড়ে সাধারণ শাড়ি ও প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে অংশ নিয়েছিলেন ৪৭ বছরের রমাবাই রণবীর। কিন্তু মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর তাগিদে সেই দৌড়ে তিনিই ছিনিয়ে নেন প্রথম স্থান।
ভারতের মহারাষ্ট্রের বীড় জেলার বাসিন্দা রমাবাই রণবীরের কাছে ম্যারাথন ছিল না কোনো বিনোদন বা প্রতিযোগিতা। দুই মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ৩ হাজার টাকার পুরস্কার জেতাই ছিল তার লক্ষ্য। কারণ ওই অর্থ দিয়ে মেয়েদের বই, টিউশন ফি ও পড়াশোনার প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে চেয়েছিলেন তিনি।
স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন রমাবাই। পরিবার আগে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও স্বামীর মৃত্যুর পর সেই আয় কমে যায়। সংসার চালাতে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে রান্না ও পরিচারিকার কাজ শুরু করেন। এক কাজ শেষ করে আরেক কাজে ছুটে বেড়ান তিনি। তার কাছে পরিশ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই; কারণ দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।
রমাবাইয়ের ছোট মেয়ে বিএসসি পড়ছেন, আর বড় মেয়ে পূজা পুলিশের চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয় মাকে।
গত ৩০ আগস্ট, রোববার ভারতের মহারাষ্ট্রের বীড়ের আম্বাযোগাই শহরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘অম্রুত দৌড়’ ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়। আড়াই কিলোমিটারের এই দৌড়ে প্রথম পুরস্কার ছিল ৩ হাজার টাকা। রমাবাইয়ের কাছে এই অর্থ ছিল অনেক মূল্যবান। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেশাদার দৌড়বিদদের সঙ্গে তিনিও অংশ নেন।
দৌড়ের শুরুতে দামি স্পোর্টস শু পরা প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে রমাবাইয়ের। হালকা বৃষ্টিতে রাস্তা কাদায় ভরে যায়। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে দৌড়াতে গিয়ে বারবার পিছলে যাচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে স্যান্ডেল খুলে হাতে তুলে নিয়ে খালি পায়ে দৌড় শুরু করেন।
কাদা, পাথর ও স্টোনচিপের পথও তাকে থামাতে পারেনি। মাথায় তখন শুধু মেয়েদের পড়াশোনার খরচের চিন্তা। শেষ পর্যন্ত সবাইকে পেছনে ফেলে ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করেন রমাবাই এবং প্রথম স্থান অর্জন করেন।
জয়ের পরও তার হাতে ছিল সেই প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। যেন সেটিই তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আরও আবেগঘন বিষয় হলো, রমাবাইয়ের পর দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তার বড় মেয়ে পূজা। মায়ের হাতে পুরস্কারের টাকা উঠলেও মেয়ের চোখে ছিল আবেগের অশ্রু।
পুরস্কার গ্রহণের সময় উদ্যোক্তারা রমাবাইকে জিজ্ঞেস করেন, এই বয়সে কীভাবে এতটা পথ দৌড়ালেন এবং একবারও কেন থামেননি। জবাবে তিনি বলেন, মেয়েদের বই কিনতে হবে, টিউশন ফি দিতে হবে—এই চিন্তাই তাকে এগিয়ে নিয়েছে। ৩ হাজার টাকা তার কাছে অনেক বড়, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ।
রমাবাইয়ের এই দৌড় শুধু একটি ম্যারাথন জয় নয়, বরং একজন মায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব নেওয়া, একাধিক বাড়িতে কাজ করা এবং নিজের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—প্রতিদিনই তার জন্য ছিল একেকটি ম্যারাথন।
সেদিন সেই লড়াই শুধু মানুষের চোখে ধরা দিয়েছে। শাড়ি ও প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে শুরু করা সেই দৌড়ে রমাবাই প্রমাণ করেছেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা মায়ের কাছে কোনো বাধাই বড় নয়। তার আসল জয় ৩ হাজার টাকার পুরস্কারে নয়, বরং দুই মেয়ের স্বপ্ন ধরে রাখার অদম্য শক্তিতে।



















