প্রতিনিধি 21 September 2026 , 6:17:47 প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে—এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর বড় অঙ্কের লোকসান সমন্বয়ের কারণেও দেশে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে একসময় তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠলেও তখন এতটা দাম বাড়ানো হয়নি—এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় (ফ্রেইট চার্জ) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ফলে বিপিসি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। এ অবস্থায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার পেছনে একাধিক ভূরাজনৈতিক সংকট কাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। এতে তেল পরিবহনের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একসঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও জাহাজের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় ও এই লোকসান সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। বিভাগটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতে (কলকাতা) ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ দশমিক ২২ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকা।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ালে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়। পরে জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত এসব জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
এদিকে দেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়ায়।
তবে সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে শুধু এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে নয়। গত কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, যুদ্ধজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসানের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

















