মোঃ মাহিন খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র—এই তিন মাসে ঝালকাঠির ভীমরুলীসহ আশপাশের জনপদ পরিণত হয় পেয়ারার রাজ্যে। দেশের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান পেয়ারা বাজারকে ঘিরে যেমন পর্যটকের সমাগম বাড়ছে, তেমনি সংরক্ষণ সংকটে লোকসান গুনছেন চাষিরা।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভীমরুলী গ্রামের খালে মৌসুমজুড়ে সারি সারি ডিঙি নৌকায় কাঁচা-পাকা পেয়ারা নিয়ে বসে ভাসমান বাজার। সকাল থেকেই বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন মোকামে। খালের দুই পাশে অবস্থান নেওয়া আড়তদার ও পাইকাররা নৌকা থেকেই এসব পেয়ারা কিনে নেন। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে বাজারে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, মিনিট্রাক ও পিকআপে করে পাইকাররা এখানে আসছেন। পাশাপাশি নৌপথেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে পেয়ারা।

ঝালকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া এবং পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক পেয়ারা অঞ্চল। ভীমরুলীর পাশাপাশি কুড়িয়ানা, আটঘর, আতা, মাদ্রাসহ আশপাশের এলাকাতেও একই জলপথকে কেন্দ্র করে বসে ভাসমান পেয়ারা বাজার। এই অঞ্চলে ২০টিরও বেশি মৌসুমি মোকাম রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মণ পেয়ারা কেনাবেচা হয় এবং এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ।
তবে এই সম্ভাবনাময় খাতের বড় সমস্যা সংরক্ষণ ব্যবস্থা। পচনশীল হওয়ায় দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে বিপুল পরিমাণ পেয়ারা নষ্ট হয়ে যায়। পর্যাপ্ত হিমাগার ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে প্রতি বছর চাষিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। জগদীশপুর গ্রামের চাষি বিমল মিস্ত্রি বলেন, হিমাগারের অভাবে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়। চাষি বিশ্বজিৎ চৌধুরীর মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পেয়ারা প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা গেলে এ খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

এ বছর খরা ও তীব্র গরমের কারণে উৎপাদনও কমেছে। ফাল্গুন মাসে মুকুল আসার সময় অতিরিক্ত তাপদাহে অনেক মুকুল ঝরে যায়, কোথাও কোথাও গাছও মারা গেছে। ফলে ১০ বিঘা বাগান থেকে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১০ মণ পেয়ারা পাওয়ার কথা, সেখানে মিলছে মাত্র ৩ থেকে ৫ মণ। বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। ভীমরুলীর চাষি ফণী ভূষণ দাস বলেন, উৎপাদন কম হওয়ায় দাম ভালো হলেও প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না।
কৃষির পাশাপাশি ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার এখন পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণ। মৌসুমজুড়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা নৌকায় ভাসমান বাজার ঘুরে দেখেন, বাগানে গিয়ে নিজের হাতে পেয়ারা সংগ্রহ করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলোহাব সায়দানিও এ বাজার পরিদর্শন করেছেন। কুড়িয়ানা পেয়ারাপার্ক পিকনিক স্পট অ্যান্ড ইকো কটেজের স্বত্বাধিকারী অর্নব মজুমদার জানান, প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে এবং পেয়ারা ও আমড়ার মৌসুমেই সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসেন।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান বলেন, পেয়ারা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চলতি বছর জেলায় ৫৬২ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, উন্নত যোগাযোগ ও পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও পর্যটন ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।



















