রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার একটি পরিবারে কয়েক বছরের ব্যবধানে বাবা ও তিন ছেলে ক্যানসারে মারা গেছেন। পরিবারের জীবিত বড় ছেলে চতুর্থ পর্যায়ের কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। একই পরিবারের আরও দুই সদস্য হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত, আর ক্যানসারে মারা যাওয়া এসারুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. ঝরনা বেগম চতুর্থ পর্যায়ের ব্রেন ক্যানসারে চিকিৎসাধীন।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি মোহনপুর উপজেলার ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আতানারায়ণপুর গ্রামের। পরিবার সূত্রে জানা যায়, পরিবারের কর্তা আব্দুল হামিদ ২০২২ সালে ৮০ বছর বয়সে লিভার ক্যানসারে মারা যান। এর আগে ২০২০ সালে প্রায় ৪৬ বছর বয়সে ছেলে সাদরুল ইসলাম একই রোগে মারা যান। পরে ২০২৪ সালে স্থানীয় আত্রাই আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক মামুন অর রশিদ (প্রায় ৪০) এবং পরের বছর প্রায় ৪০ বছর বয়সে এসারুল ইসলামও লিভার ক্যানসারে মারা যান।
এসারুল ইসলাম মোহনপুর মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে ২০১১ সালে গাজীপুরের মেয়ে ঝরনা বেগমকে বিয়ে করেন। স্বামীর চিকিৎসার জন্য চারবার ভারতে যেতে হয়েছিল তাদের। চিকিৎসায় প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। শেষবার চিকিৎসকেরা এসারুলের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলে ভারতে অবস্থানকালেই ঝরনা বেগম ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তার মস্তিষ্কে ক্যানসার ধরা পড়ে। বর্তমানে তার ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে। নিয়মিত কেমোথেরাপি চলছে এবং ঢাকায় অস্ত্রোপচারও হয়েছে। ব্রেন স্ট্রোকের পর তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে গেছে এবং স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হয়েছে।
ঝরনা বেগমের দুই সন্তান—১১ বছরের ইসরাত জাহান ও পাঁচ বছরের জুনায়েদ ইসলাম—এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরে জুনায়েদ মায়ের কাজে সাহায্য করে। আর ইসরাত অনেক সময় আগের দিনের তরকারি দিয়ে ভাত নিয়ে স্কুলে যায়। ঝরনা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। মানুষের সহায়তায় ওষুধ কেনেন, তবে অর্থাভাবে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারেন না। তার প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন।
পরিবারের জীবিত বড় ছেলে ও স্থানীয় আতানারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ২০২২ সালে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তার অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া পরিবারের ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন (৩৮) এবং বড় মেয়ে রাশেদা (৪২) হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত। হাবিবা খাতুনের (৩৭) পেটে আলসার ও পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে। ছোট দুই বোন নাসিমা ও ফারহানা বর্তমানে সুস্থ থাকলেও পরিবারের ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় তারা উদ্বেগে রয়েছেন।
স্বজনদের দাবি, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমি বিক্রি ও বন্ধক রাখতে হয়েছে। এসারুল ইসলামের চিকিৎসার জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় আট লাখ টাকার ঋণের মধ্যে এখনো প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ বাকি রয়েছে। সম্প্রতি তিন মাসের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দিতে নিজের মুঠোফোনও বিক্রি করেছেন ঝরনা বেগম।
প্রতিবেশী মো. আলম বলেন, একসময় পরিবারটি এলাকায় সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারের প্রায় সবাই চাকরিজীবী ছিলেন এবং তাদের মধ্যে পিএইচডিধারী একজন অধ্যাপকও ছিলেন। আরেক প্রতিবেশী মোছা. ফারহানা বলেন, একের পর এক মৃত্যু ও চিকিৎসার ব্যয়ে পরিবারটি এখন চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তিনি পরিবারটির চিকিৎসা ও শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
মোহনপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হোসেন শামীম জানান, পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। রোগী কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকেও কিছু ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় প্রয়োজন হলে রাজশাহীর এসওএস শিশু পল্লীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতিও রয়েছে।



















