গাইবান্ধা,সাধারণত আঙুর চাষের কথা উঠলে চোখে ভেসে ওঠে বিদেশ কিংবা দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বাগান। সেই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কৃষিপ্রেমী শিক্ষক মো.এমদাদুল হক রাজা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে আঙুর চাষে সফল।
শখের বসে শুরু করা আঙুর চাষই এখন তার সাফল্যের নতুন গল্পে পরিণত হয়েছে। বাগানের মাচায় ভিন্ন জাত ও ভিন্ন রঙের থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা আঙুর নজর কাড়ছে এলাকাবাসীর। আঙুরের এমন ফলন ব্যাপক কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে।
শিক্ষক এমদাদুলের বাড়ি সুন্দরগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে ৪ কিলোমিটার দূরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম পূর্ব বাছহাটিদেতে। শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষির প্রতি মমত্ববোধই একসময় তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় কুড়িগ্রামের রুহুল আমিন নামের এক ব্যাংকারের সাথে। সেই পরিচয়ই তাকে আগ্রহী করে তোলে আঙ্গুর চাষে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার ধারে থাকা মাত্র ৭ শতক জমিতে বাইকুনুর, একোলো, গ্রীণ লং, জয় সীডলেস, ডিকসন, ভ্যালেজ, ট্রান্সফিগারেশন, অ্যাকাডেমিক, লোরাস, ক্রীসমন সীডলেস, মানিক চমন, এসএসএন, রেবেকা, জেসমিনসহ বিভিন্ন জাতের ৫০টি আঙুর গাছ লাগিয়েছেন কৃষি বিষয়ের শিক্ষক রাজা। তার বাগানের নাম দিয়েছেন ‘কৃষিবিদ আঙুর বাগান’। ৪ বছর আগে ধাপে-ধাপে এসব জাতের চারা রোপণ করা হলেও বাইকুনুর, গ্রীণ লং, ভ্যালেজ এবং প্রেসটিজ নামক আঙুরের গাছে ফল ধরা শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। বাগানের ওপর ও চারপাশে দেয়া হয়েছে জালের আচ্ছাদন।
বাগানে প্রবেশ করেই চোখে পড়ছে মাচার নিচে ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় আঙুর। হালকা সবুজ, হালকা গোলাপী ও জাম রঙের এসব আঙুরের থোকা নজর কাড়বে যে কারো। একেকটি থোকায় আঙুর ধরেছে ৪০০-১০০০ গ্রাম পর্যন্ত। আর প্রতিটি গাছে উৎপাদন হবে প্রায় ১০-১৫ কেজি। বাজারে পাওয়া আঙুরের চেয়ে তার উৎপাদিত আঙুর স্বাদ ও গুণগত মানে অনন্য হওয়ায় এর এলাকায় এর চাহিদাও রয়েছে বেশ।
‘কৃষিবিদ আঙুর বাগান’টি রাস্তার ধারে হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার শৌখিন মানুষেরা আসছেন রাজার এ বাগান দেখতে। পরখ করে দেখছেন তারা আঙুরের স্বাদ ও গুণগত মান।
তারা বলছেন, আমাদের এলাকাতেও যে আঙুরের চাষ করা সম্ভব তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। তাছাড়া এসব আঙুর তো দেখছি বাজারের আঙুরের চেয়েও মিষ্টি ও সুস্বাদু!
দর্শনার্থী এ এম মাসুদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘ভিডিওতে আঙুর চাষ দেখেছি, কিন্তু এখানে এসে সরাসরি এত আঙুর ফলতে দেখে খুব ভালো লাগছে। আমরাও চারা লাগানোর কথা ভাবছি।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারিত হলে ভবিষ্যতে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সরবরাহ সম্ভব হবে।
উদ্যোক্তা এমদাদুল হক রাজা বাসস’কে বলেন, কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করায় কৃষির প্রতি আমার ঝোঁক একটু বেশিই ছিল। বিশেষত আঙুর চাষের প্রতি। ৩-৪ বছরের চেষ্টায় এখন আমি অনেকটা সফল। ২৬ ধরনের আঙুরের চারা লাগিয়েছি। তারমধ্যে রাশিয়ান জাতের বাইকুনুর, গ্রীণ লং, ভ্যালেজ এবং প্রেসটিজ নামক আঙুরের গাছে ফল ধরা শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। গত বছরের চেয়ে এ বছর ফলন আরো ভালো হচ্ছে। এক একটি গাছ অন্তত ২০-৩০ বছর ফল দেবে। বাজারের আঙুরের চেয়ে এর স্বাদ খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। এর কারণ আমি চাষে জৈব সারের প্রতি জোর দিয়েছি। অন্যান্য জাতগুলোর গাছ ছোট হওয়ায় আশাকরি আগামী বছর সেগুলোও ফল দেবে। এবছরে অন্তত আড়াই-তিন মণ আঙুর আসবে। প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দামে বিক্রি করছি।
তিনি আরও বলেন, বেলে-দোআঁশ মাটি আঙুর চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এজন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করতে আমি আরো চারা উৎপাদন করছি। কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে আমি সহযোগিতা করব। এতে পরিবারের চাহিদা মেটনোর পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারবেন উদ্যোক্তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বাসস’কে বলেন, শিক্ষক এমদাদুল হক রাজার বাগানে লাগানো ২২ জাতের আঙুরের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪ জাতের আঙুর গাছে ফল ধরেছে। আঙুরগুলো খুবই সুমিষ্ট। এ এলাকার মাটি আঙুর চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা করা হবে।



















