রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ন
ফয়ছল আহমদ নুমান, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা ছনবাড়ি বাজারে নির্মিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ১৯৯০ সালে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সরকারি ভবনটি এখন ঝোপঝাড় আর জীর্ণতায় ঢেকে গেছে। মাত্র কয়েক শতক জায়গার মালিকানা নিয়ে চলমান মামলার কারণে বন্ধ হয়ে আছে ১০-১২টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও এখান থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি ওষুধ পেতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০০২ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘ দুই যুগের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটি পুনরায় চালু করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের দেয়াল ও ছাদে ফাটল ধরেছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ইউনিয়নটি ছোট-বড় টিলা ও নদীবেষ্টিত। ছনবাড়ি বাজার থেকে উপজেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে একজন সাধারণ রোগীর সময় লাগে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। অনেক সময় জরুরি অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর সাহেব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যখন এই এলাকায় বড় হয়েছি, তখন দেখেছি সামান্য অসুখ-বিসুখে মানুষ এই কেন্দ্রে আসত। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে এটি তালাবদ্ধ। আমাদের চোখের সামনে সরকারি ভবনটি জঙ্গল আর লতাপাতায় ঢেকে গেল, দেয়ালে ফাটল ধরল, অথচ দেখার কেউ নেই। সামান্য জ্বরের ওষুধ বা প্রাথমিক ড্রেসিং করার জন্যও এখন আমাদের ১৫ কিলোমিটার দূরে শহরে যেতে হয়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “এই এলাকাটি টিলা আর নদীবেষ্টিত। যাতায়াত ব্যবস্থা এতই খারাপ যে, ছাতক সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী কিংবা রাতের বেলা কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জীবন-মরণ যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়ায়। আমরা চাই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করে এই ভবনটি সংস্কার করা হোক এবং অবিলম্বে ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হোক।”
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার ময়না মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আমাদের এলাকার মানুষের জন্য আশার আলো ছিল। কিন্তু জায়গার মালিকানা সংক্রান্ত মামলার কারণে এটি বন্ধ হয়ে আছে। ২৩ বছর ধরে ১০ থেকে ১২টি গ্রামের মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। আমাদের এখানে কোনো ডাক্তার নেই, জরুরি অবস্থায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। আমরা চাই দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করে এটি চালু করা হোক।”
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেল জানান, “দুটি পক্ষ জায়গার মালিকানা দাবি করায় বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। এই মামলার কারণেই মূলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে আছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর উপজেলা সমন্বয় সভায় বেশ কয়েকবার বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং সমাধানের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আইনি জটিলতা থাকায় এখনো কোনো কার্যকরী সমাধান আসেনি। এটি চালু হওয়া অত্র এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “আমি এই উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি। ছনবাড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। আইনি জটিলতা কাটিয়ে কীভাবে এটি দ্রুত পুনরায় চালু করে জনসেবার উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট না করে দ্রুত আইনি বাধা দূর করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হোক।
2025 © জনপদ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রয়োজনে যোগাযোগঃ ০১৭১২-০৬৮৯৫৩