প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জেলার নদী ও সাগরে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও এ বছরের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। মৌসুম শুরু হলেও আশানুরূপ ইলিশের দেখা না পাওয়ায় হতাশায় দিন কাটছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার কয়েক হাজার জেলের। নদী ও সাগরে জাল ফেলেও মাছ না পাওয়ায় দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন জেলেরা। ফলে বরগুনা জেলা শহরের মৎস্য বাজার ও আড়তগুলোতে ইলিশ মাছের সংকট দেখা দিয়েছে।
সকালের সূর্যের আলো ফুটতেই বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী এলাকার অধিকাংশ জেলে শত শত ট্রলার নিয়ে ছুটে যান গভীর সমুদ্রে। কিন্তু কাঙ্খিত পরিমাণ ইলিশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন তারা। ফলে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন খাতের খরচ মিটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জেলেদের।
পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানি এলাকার জেলে আবুল কালামের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গত ২-৩ বছর আগে সাগরে যে পরিমাণ ইলিশ পেয়েছি, এখন আর সেই পরিমাণ ইলিশ পাইনা। তাছাড়া আগের তুলনায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এক ট্রিপে বিভিন্ন খরচ মিটিয়ে লাভ তো হয়ই না, আরো লোকসানে পড়তে হয়।
বরগুনা সদর উপজেলার ডাল ভাঙ্গা এলাকার জেলে লোকমান হোসেন বলেন, মাছের আশায় ট্রলার নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আশানুরূপ ইলিশ মাছ না পেয়ে ৪ দিন পরে ফিরে এসেছি। আয় না হওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি।
সদর উপজেলার নলী এলাকার জেলে মজিবর বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। তিনদিন ধরে সাগরে ছিলাম, কিন্তু জালে সামান্য কিছু ইলিশ পেয়ে বাড়ি ফিরে আসি।
জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বাসস’কে বলেন, সাগর থেকে ফেরা জেলেরা আমাকে জানিয়েছে কিছু অসাধু জেলে ট্রলিং ট্রলারে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে গভীর সাগরে মাছ ধরছে প্রতিনিয়ত। আর এতে বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছসহ ইলিশ মাছের সংকট দেখা দিয়েছে।
গতকাল রোববার থেকে বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল হয়ে পড়ায় শতশত ট্রলার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফেরত এসেছে। এতে জেলেরা আরও চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এসব জেলেদের মধ্যে অনেকেই ঋণ করে ট্রলার পরিচালনা করছেন। আর বর্তমান সময়ে ইলিশ মাছ না পাওয়ায় জেলে পরিবারগুলোর সদস্যরা আর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন।
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইলিশ প্রজনন,সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাঞ্জাকালীন সময় সুবিধাভোগী জেলেরা সরকারি প্রণোদনা পান। বরগুনায় সরকারি প্রণোদনার আওতায় ২৭ হাজার জেলে রয়েছেন। এরমধ্যে ২৬ হাজার জেলে প্রণোদনা পেয়ে থাকেন। আর প্রণোদনা পেয়ে জেলেরা ওই সময়ে কোনো মতে সংসার চালান। তবে প্রণোদনার বাহিরেও অনেক জেলে রয়েছেন এবং অনেক জেলের নিবন্ধনের তালিকায় নাম নেই। যারা এখনো নিবন্ধিত হতে পারেনি, তারা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারের এই প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হন।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বেসরকারিভাবে অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার হবে। আর নিবন্ধিত নারী জেলে রয়েছেন ৬৪০ জন।
জেলেরা বলেন, সরকার এ দুর্যোগকালীন সময়ে যদি ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের বিশেষ প্রণোদনা দেয় ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে, তাহলে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আমরা সাগরে গিয়ে যদি পর্যাপ্ত মাছ পাই তাহলে আমরা আমাদের ঋণ শোধ করতে পারবো এবং সংসারেও স্বচ্ছলতা ফিরবে।
বরগুনা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী জহিরুল হক পনু বলেন, কিছুদিন ধরে সমুদ্রে ও নদীতে জেলেদের জালে তেমন একটা মাছ ধরা পড়ছেনা। খুবই কম পরিমাণ ইলিশ নিয়ে ট্রলারগুলো ফিরছে ঘাটে।
তিনি জানান, গতকাল রোববার থেকে বৈরি আবহাওয়া শুরু হওয়ায় পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেয়া হয়েছে। সমুদ্রে যেসব জেলেরা মাছ ধরতে গিয়েছিল তারা ট্রলার নিয়ে বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে আজ সকালে বরগুনা মাছ বাজরে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতা রফিকুল ইসলাম মাঝারি সাইজের ইলিশ ক্রয় করেছেন ৯শ’ টাকায়। তিনি জানান, মাছের দাম আগের তুলনায় একটু বেশি। বাজারে ইলিশের আমদানি কম।
মাছ বিক্রেতা আবদুস সালাম বলেন, এ মৌসুমে বেশ কয়েকদিন ধরে সাগর ও নদীতে তেমন মাছ না পাওয়ায় বর্তমানে বাজারে দাম একটু বেশি। বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম ১২শ’ টাকা, মাঝারি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯শ’ টাকায় এবং ছোট সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬শ’ টাকায়।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকা। বর্তমান সময়ে ইলিশ না পাওয়ায় ধারদেনা করে এক ট্রিপ দিলেও ঋণের টাকা শোধ করা নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জলবায়ু পরিবর্তনে আবহাওয়ার বৈরিতা, নদীর নাব্যতা সংকট এবং সাগরে মাছের বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা।
পাথরঘাটা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বাসস’কে বলেন, গতকাল রোববার থেকে বৈরি আবহাওয়ার কারণে শতশত ট্রলার নিয়ে জেলেরা এখন নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নিয়েছে। জেলে ও ট্রলার মালিকদের জীবন সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থেই সাগরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে জেলেরা আবার সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারবেন।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বাসস’কে বলেন, জেলায় ৪৮ হাজার ৬ শত নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জালের বিরুদ্ধে আমাদের মৎস্য বিভাগ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ইলিশের মৌসুমে আশানুরুপ মাছ না পাওয়ায় জেলেদের হতাশা শুধু একটি পেশার সংকট নয়, এর প্রভাব পড়ছে কয়েক হাজার জেলে পরিবারে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।



















