একসময় পদ্মায় জাল ফেললেই রুপালি ইলিশে ভরে উঠত জেলেদের ডোল। তবে এখন নদীতে আগের মতো ইলিশ না পাওয়ায় সংকটে পড়েছে মানিকগঞ্জের পদ্মাপাড়ের মৎস্যজীবীদের জীবন।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পদ্মার ইলিশ ছিল এসব এলাকার জেলেদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নদীতে ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেক জেলে মাছ ধরা ছেড়ে বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্যেও লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ৬২২ মেট্রিক টনে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন, যা প্রায় ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। শুধু ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যেই ইলিশ আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।
সরকারি তথ্যের সঙ্গে নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতাতেও মিল পাওয়া যাচ্ছে। হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী বলেন, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। তার মতে, নদী আগের মতো গভীর না থাকায় ইলিশের আনাগোনাও কমেছে।
ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লা বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশের বিচরণ কমে যাচ্ছে। আর দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন জীবিকার সংকটে নৌকা ও জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। সমুদ্র থেকে মিঠাপানির নদীতে ডিম ছাড়ার জন্য আসার পথে পলি জমে তৈরি হওয়া ডুবোচর ও চর বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বর্জ্যে পানিদূষণ এবং নদীর খাদ্যচক্রের পরিবর্তনও ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন হওয়ায় ইলিশের প্রজনন প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সংরক্ষণে ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা করা হয়েছে, ৭০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযান চলাচল, দূষণ ও অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।



















