গরু ও ছাগল পালনের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষক ও খামারিদের মধ্যে মহিষ, ভেড়া ও গাড়ল পালনের আগ্রহ বাড়ছে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল, নাটোর ও নন্দীগ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এসব প্রাণী পালনের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সরকারি সহায়তা।
প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সচেতন খামারি ও পশুপালনকারীদের চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার আওতায় আনা গেলে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে এসব প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখনো মহিষ, ভেড়া ও গাড়লের উৎপাদন নিয়ে জেলা বা উপজেলা-ভিত্তিক নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট মাংস উৎপাদন হয়েছে ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ মেট্রিক টন। একই সময়ে দেশের মাংসের চাহিদা ছিল ৭৭ দশমিক ৯২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন চাহিদার তুলনায় প্রায় ১১ দশমিক ৬২ লাখ টন বেশি। এ সময়ে মাথাপিছু দৈনিক মাংসের প্রাপ্যতা ছিল ১৩৭ দশমিক ৯০ গ্রাম, যেখানে চাহিদার হিসাব করা হয়েছে ১২০ গ্রাম।
তবে জাতীয় উৎপাদনের এই হিসাব দেশের সব এলাকায় সব ধরনের মাংসের সমান সরবরাহ নিশ্চিত করে না। প্রজাতি, অঞ্চল, বাজার পরিস্থিতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও মৌসুমি চাহিদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের কোরবানির তথ্য অনুযায়ী, পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি এবং দেশীয়ভাবে প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ মিলিয়ে ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৮টি এবং ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ৪৫ লাখ ২ হাজার ২৩৩টি পশু কোরবানি হয়েছে।
চরাঞ্চলে মহিষ পালনের সম্ভাবনা
বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের নদীভাঙনপ্রবণ চরাঞ্চলে কৃষির পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ পালন গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম উৎস হতে পারে। এসব এলাকায় মৌসুমভেদে জমির ব্যবহার পরিবর্তিত হয়। অনেক স্থানে নিয়মিত ফসল উৎপাদন কঠিন হলেও ঘাস, খড় ও প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর নির্ভর করে পশু পালন তুলনামূলক সহজ।
বিশেষ করে মহিষ চরাঞ্চলের জন্য সম্ভাবনাময় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুধ ও মাংস—দুই ক্ষেত্রেই মহিষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ঘাস উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে মহিষ পালন কোরবানির বাজারের পাশাপাশি সারা বছরের মাংস ও দুগ্ধ বাজারেও ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটেও মহিষ, ছাগল ও ভেড়াসহ বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম রয়েছে।
ভেড়া ও গাড়ল পালনে ছোট খামারে সম্ভাবনা
গরুর তুলনায় ভেড়া ও গাড়ল পালনে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক কম হতে পারে। ফলে ছোট কৃষক পরিবারগুলো কয়েকটি মা ভেড়া বা গাড়ল দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে খামার বড় করার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বড় গরুর খামারের জন্য পর্যাপ্ত জমি বা মূলধন জোগাড় করতে পারে না, তাদের জন্য এসব প্রাণী বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে।
সরকারি যুব উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় গাড়ল পালন প্রশিক্ষণও চালু রয়েছে। রাজশাহী যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাত দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণে প্রতি ব্যাচে ৪০ জন করে বছরে দুটি ব্যাচে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে বোঝা যায়, গাড়ল পালনকে শুধু পারিবারিক পশুপালন নয়, উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
লাভের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা
মহিষ, ভেড়া ও গাড়ল পালন লাভজনক হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও খামারিরা। তবে লাভ নির্ভর করবে পশুর জাত, খাদ্য ব্যয়, রোগব্যাধি, মৃত্যুহার, বাচ্চা উৎপাদনের হার, বাজারদর ও বিক্রির সময়ের ওপর।
ভেড়া ও গাড়লের ক্ষেত্রে দ্রুত বংশবৃদ্ধির সুযোগ থাকায় ছোট খামার কয়েক বছরের মধ্যে বড় পাল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যদিকে মহিষের ক্ষেত্রে দুধ ও মাংস—দুই খাত থেকেই আয় করা যায়। কর্মসংস্থান ব্যাংকের ঋণ কর্মসূচির আওতায় গরু মোটাতাজাকরণের পাশাপাশি ছাগল, ভেড়া ও মহিষ পালনের মতো কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে শুধু পশু কিনে পালন করলেই লাভ নিশ্চিত হবে না। উন্নত জাত, টিকা, কৃমিনাশক, সুষম খাদ্য, প্রশিক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় অর্থনীতিতে বাড়তে পারে কর্মসংস্থান
মহিষ, ভেড়া ও গাড়লের উৎপাদন বাড়লে এর প্রভাব শুধু খামারির আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশুখাদ্য উৎপাদন, ঘাস চাষ, পরিবহন, পশুর হাট, ওষুধ ও ভেটেরিনারি সেবা, শ্রমিক, মাংস বিক্রেতা, কসাইখানা, চামড়া ও উপজাত পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে কৃষিজমির নিশ্চয়তা কম থাকা চরাঞ্চলে প্রাণিসম্পদভিত্তিক অর্থনীতি গ্রামীণ পরিবারের আয়ের উৎসকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে।
রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের জন্য মাংস রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এটি এখনো বড় পরিসরের রপ্তানি শিল্পে পরিণত হয়নি। সরকারের রপ্তানি নীতিমালা ২০২৪-২০২৫-এ হালাল গোশত উৎপাদনকে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর রপ্তানিকারক তালিকায় মাটন বা ভেড়া-ছাগলের মাংস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত পশু উৎপাদনের পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের জবাইখানা, হালাল সার্টিফিকেশন, রোগমুক্ত পশু, স্বাস্থ্যসম্মত মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (SPS) মান পূরণ।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল, নাটোর ও নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে মহিষ, ভেড়া ও গাড়লের ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদন অঞ্চল গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানির ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমে কোথায় কত মহিষ, ভেড়া ও গাড়ল রয়েছে তার নির্ভরযোগ্য উপজেলা-ভিত্তিক জরিপ প্রয়োজন। এরপর সম্ভাবনাময় চর ও গ্রামীণ এলাকায় উন্নত জাত, প্রজনন কেন্দ্র, পশু চিকিৎসা, টিকা, খাদ্য উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও স্বল্পসুদের ঋণের সমন্বিত ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশের মাংস উৎপাদন ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাড়িয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের মান, প্রজাতির বৈচিত্র্য, বাজারব্যবস্থা ও রপ্তানিযোগ্যতা বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে মহিষ, ভেড়া ও গাড়ল পালন প্রাণিসম্পদ খাতের বহুমুখীকরণের একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে।
বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল, নাটোর এবং নন্দীগ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাণিসম্পদ ক্লাস্টার হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।



















