প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমূলক ও গণমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মাহদী আমিন সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপও তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং জনগণের সমর্থনকে ভিত্তি করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
সরকারের ছয় মাসের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে তিনি জানান, মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সুদে-আসলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যার ফলে ১৩ লাখের বেশি কৃষক উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য সরকারি ভাতা প্রদান, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রশংসা পেয়েছে। কার্ড বিতরণে কিছু কারিগরি অসঙ্গতি ধরা পড়ায় ডেটাবেজ হালনাগাদ এবং ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ সংস্কারের কাজও চলছে।
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর রমজান ও দুই ঈদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে মার্কিন ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প উৎস থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস ও জ্বালানি নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শ্রমবাজার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শেষে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগস্টের শেষ নাগাদ এ জটিলতার সমাধান হতে পারে এবং পরবর্তী চার মাসে এক লাখের বেশি কর্মী সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এছাড়া রিয়েল এস্টেট, এগ্রিকালচার ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতেও কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপান, ওমান, জর্ডান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে ভাষা প্রশিক্ষণ এবং জামানতহীন বিশেষ ঋণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে এবং সরকার সমালোচনার মধ্যেও রাজনৈতিক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ ও প্রশাসনকে সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কাজ চলছে এবং ছোট-বড় সব অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো অপরাধীকে দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান সরকারের নীতির মূল ভিত্তি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তাঁর ভাষ্য, ভারতসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে সরকার আগ্রহী। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার আইনি প্রক্রিয়ায় ভারত সহযোগিতা করবে বলে সরকারের প্রত্যাশার কথাও তিনি জানান।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার ব্যবসা সহজীকরণ, ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কার্যকর করা, বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্গো সেবা চালু এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে সততা, সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে।



















