ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর গ্রামের সফল কৃষি উদ্যোক্তা আবু সাঈদ সরকার। চাকরি ছেড়ে ড্রাগন ফল চাষ করে পেয়েছেন ব্যাপক সফলতা। চারা উৎপাদন, ফল বিক্রি ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে সফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি আবু সাঈদ এখন সফল ব্যবসায়ী। তবে আবু সাঈদের এই যাত্রা প্রথম দিকে এতটা সহজ ছিল না। পরিচিত লোকজনের কটু কথা ও কয়েক দফা লোকসান গুনেও ড্রাগনের আবাদ চালিয়ে গেছেন এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। তার উৎপাদিত ফল এখন সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন শহরে। এই ফল রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর বাজারে ড্রাগন ফলের শতাধিক পাইকারি আড়ত রয়েছে। এসব আড়তের মধ্যে অন্যতম একটি আবু সাঈদের ফলের আড়ত। ২০২২ সালে প্রথম ‘আয়ান ফল ভান্ডার’ নামে ফলের আড়ত করেন তরুণ আবু সাঈদ সরকার। পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আড়তের বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হন তার বড় ভাই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা আবু সাঈদ সরকার বাসস’কে জানান, তিনি একটি এনজিও সংস্থায় ভালো পদে চাকরি করতেন। কিন্তু দেশের বাজারে বিদেশী ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকায় তার ভেতরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত বিদেশী ফলের আবাদ করার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই ভাবনা থেকে ২০২১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। নিজের দেড় বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। একই সময় নিজের জমিতে কাজ করার পাশাপাশি চাচাতো ভাইয়ের জমিতেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন আবু সাঈদ সরকার। ২০২২ সালের শেষদিকে তিনি গৌরীনাথপুর বাজারে ফলের আড়ত চালু করেন। নিজের বাগানের ফল বিক্রির পাশাপাশি অন্যান্য কৃষকদের কাছ থেকে ফল কিনে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ শুরু করেন।
আবু সাঈদ সরকার বাসস’কে বলেন, আমার প্রথম যাত্রা অনেক কঠিন ছিল। অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছি। দিনে চারশ’ টাকা মজুরি পেতাম। কিন্তু তা দিয়ে আমার সংসার চলতো না। তাই, চাকরি ছেড়ে কৃষি কাজ শুরু করায় মানুষ আমাকে নিয়ে নানা রকম কথা বলেছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। ২০২১ সালের অক্টোবরে ড্রাগন চাষ শুরুর পর থেকে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করি। ভ্যানে করে সেই সব চারা আমি ঝিনাইদহ শহর, কালীগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গায় বিক্রি করতাম। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় আমি ড্রাগনের চারা পাঠাতাম।
তরুণ এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, ড্রাগনের চারা বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় দিনশেষে লোকসান মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতাম। কিন্তু আমি হতাশ হইনি। এভাবে বছর দুয়েক কষ্ট করেছি। তারপর আড়ত চালু করলাম। বেচাকেনা বেড়ে গেল। আড়ত ও ফল বাগানের বিভিন্ন ধরণের ভিডিও বানিয়ে আমি ফেসবুকে ছাড়তাম। মানুষ আমার ভিডিও দেখে ড্রাগন ফলের চারা ও ফল কিনতো। এভাবেই আমার শুরু।
আবু সাঈদ সরকার আরও বলেন, এখন আমার প্রায় ১২ বিঘা জমিতে ড্রাগনের আবাদ রয়েছে। আমার দেয়া চারা থেকে গাজীপুরের মাওনা, চাঁদপুর, কুমিল্লার নিমসার, খাগড়াছড়ি, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ড্রাগন বাগান গড়ে উঠেছে। এখন আমার আড়তে গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার কেজি ড্রাগন ফলের বেচাকেনা হয়। বাগানেও ড্রাগনের ফলন ভালো এসেছে।
আড়তের বেচাকেনা প্রসঙ্গে তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা বাসস’কে বলেন, আমি মনে করি, বেকার বলে কিছু নেই। মানুষ কখনো বেকার থাকে না। চাকরির পেছনে না ছুটে অল্প পুঁজি নিয়ে নিজের মতো করে কিছুর করার উদ্যোগ নিলেই তরুণরা সফল হতে পারে। মনে রাখতে হবে, শুরুটা কখনো বড় কিছু দিয়ে হয় না। ছোট কিছু দিয়ে, অল্প অল্প করে শুরু করতে হয়। এভাবে একদিন বড় হওয়া যায়। উদ্যোক্তা হলে বরং আরও মানুষের কাজের সুযোগ করে দেয়া যায়। আমার আড়তে ও ফলের বাগানে অনেকেই এখন কাজ করে। তাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। মিল, কলকারখানা বা শিল্প নির্ভর ব্যবসায় উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়া আমার কাছে নিরাপদ ও গৌরবের। আলহামদুলিল্লাহ এখন অনেক ভালো আছি।



















