দেশের শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব থাকলেও পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেডে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ইপিজেড থেকে ২৮৯ দশমিক ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি।
পাকশীতে অবস্থিত ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এখানে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, উইগ, ব্যাটারি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লাভস, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, কেমিক্যাল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, টেক্সটাইল, ইয়ার্ন ও রাবার পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
ঈশ্বরদী ইপিজেডের ব্যবস্থাপক এ বি এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঈশ্বরদী ইপিজেডের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো। কারখানাগুলোতে উৎপাদন ও রপ্তানি-বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবে চলছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে।’
তিনি জানান, সম্প্রতি তিনটি টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনের জন্য চীনের তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এসব কারখানা চালু হলে কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু করা গেলে ইপিজেডে নতুন কারখানা স্থাপন ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বেপজার জনসংযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আনোয়ার পারভেজ বলেন, ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রচলিত রেডিমেড গার্মেন্টসের বাইরে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এটি দেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনছে।
তিনি জানান, দেশের আটটি ইপিজেডের মধ্যে মোট রপ্তানির দিক থেকে ঈশ্বরদী ইপিজেডের অবস্থান সপ্তম। দেশের প্রথম লিড প্লাটিনাম সার্টিফায়েড গ্রিন ফ্যাক্টরি ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও’ও এখানে অবস্থিত। পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
দুই দশকের বেশি সময়ের যাত্রায় ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম অংশীদার হয়ে উঠেছে। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) বর্তমানে আটটি ইপিজেড ও একটি বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ঈশ্বরদী ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে।
বেপজা সূত্রে জানা যায়, পাকশীর পদ্মা নদীর তীরে ৩০৮ দশমিক ৯৭ একর জমিতে ইপিজেড নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালের ১৩ জানুয়ারি উদ্বোধনের পর এখানে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়। ইপিজেডের ৩২৪টি প্লটই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি কারখানা চালু রয়েছে এবং আরও ৯টি কারখানা বাস্তবায়নাধীন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে।
ঈশ্বরদী ইপিজেডে সম্পূর্ণ বিদেশি, দেশি-বিদেশি যৌথ এবং সম্পূর্ণ দেশি—এই তিন ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১টি। বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, কানাডা ও মার্শাল আইল্যান্ড। ইপিজেডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নিজস্ব সাবস্টেশন রয়েছে। পাশাপাশি পানি ও গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বর্তমানে ঈশ্বরদী ইপিজেডে ২০ হাজার ৯২৯ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ হাজার ৩৯৫ জন এবং নারী ১৪ হাজার ৫৩৪ জন। এছাড়া ৮৫ জন বিদেশি কর্মী রয়েছেন। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ইপিজেডকে ঘিরে স্থানীয় এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়েছে।
বেপজা সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঈশ্বরদী ইপিজেড থেকে ২৮৯ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ২৫৮ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১৭ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।
রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কারণে ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।



















