আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গরু-মহিষ দিয়ে হালচাষের ঐতিহ্য। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়লেও এর সঙ্গে বিলীন হচ্ছে গ্রামবাংলার পুরোনো কর্মসংস্কৃতি ও কৃষি ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ।
একসময় ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা গরু-মহিষ, কাঠের লাঙল, বাঁশের জোয়াল ও মই নিয়ে মাঠে নামতেন। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর তেমন দেখা যায় না। ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মোট আবাদি জমি ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ১ হাজার ৩১০, দুই ফসলি ১৩ হাজার ৫২০, তিন ফসলি ৮ হাজার ৬৮০, চার ফসলি ৮৫০ এবং পাঁচ ফসলি জমি ৪০ হেক্টর। বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে মোট ফসলি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৭৯০ হেক্টর এবং ফসলের নিবিড়তা ২৩৭ শতাংশ।
কৃষিনির্ভর এ উপজেলায় ধান, ভুট্টা, গম, পাট, আলু, সরিষা, শাকসবজি, চিনাবাদাম ও বিভিন্ন ডালজাতীয় ফসলের আবাদ হয়। মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি তিস্তা নদীর চরাঞ্চলেও মৌসুমি ফসল উৎপাদন করছেন কৃষকেরা। আগে এসব জমিতে গরু-মহিষ দিয়ে হালচাষের প্রচলন থাকলেও এখন পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও রোটাভেটরের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একইভাবে ফসল কাটার ক্ষেত্রেও কম্বাইন হার্ভেস্টারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
একসময় বলদ গরু, কাঠের লাঙল, বাঁশের জোয়াল, মই, গরু তাড়ানোর ‘লরি’ ও মুখে পরানো ‘টোনা’ ছিল কৃষিকাজের অপরিহার্য উপকরণ। হালচাষের সময় গরুর গোবর জমিতে পড়ে প্রাকৃতিক জৈব উপাদান যোগ করত, যা জমির উর্বরতা বজায় রাখতে সহায়ক ছিল। কিন্তু বর্তমানে শ্রমিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় এবং কম সময়ে জমি প্রস্তুতের প্রয়োজনীয়তার কারণে কৃষকেরা ক্রমেই যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছেন।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নের কালিডাঙ্গা গ্রামের কৃষক হযরত আলী বলেন, ‘ছোটোবেলায় হালচাষের কাজ করতাম। বাড়িতে হালচাষের জন্য দুই-তিন জোড়া বলদ গরু ছিল। চাষের কাজে এক জোড়া বলদ, কাঠের লাঙল, বাঁশের জোয়াল ও মই লাগত। গরু তাড়ানোর জন্য বাঁশের তৈরি “লরি” এবং গরুর মুখে “টোনা” ব্যবহার করা হতো।’ তিনি বলেন, ‘আগে গরু দিয়ে হালচাষ করলে গোবর জমিতে পড়ে জৈবসার হিসেবে কাজ করত। এখন আধুনিক যন্ত্রের কারণে গরু, লাঙল ও জোয়াল নিয়ে হালচাষ হারিয়ে যেতে বসেছে।’
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের কলোনীপাড়া গ্রামের কৃষক আয়নাল হক বলেন, ‘গরুর লাঙল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ শতাংশ জমি চাষ করা সম্ভব। আগে হালচাষের পাশাপাশি গোবর জমির উর্বরতা বাড়াত। এখন আধুনিক যন্ত্রের কারণে গরুর লাঙল দিয়ে চাষাবাদ অনেকটাই কমে গেছে। গরুর গাড়িও এখন খুব কম দেখা যায়, পহেলা বৈশাখের মতো আয়োজনে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে।’
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, ‘বর্তমানে কৃষিতে শ্রমিক সংকট ও উৎপাদন খরচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কৃষকেরা কম সময়ে জমি প্রস্তুত করে আবাদ করতে চান। তাই পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও রোটাভেটরের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গরু-মহিষ দিয়ে হালচাষের প্রচলন স্বাভাবিকভাবেই কমে যাচ্ছে। তবে লাঙল-জোয়াল ও হালচাষ আমাদের কৃষি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। আধুনিক কৃষির পাশাপাশি এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগও থাকা উচিত।’



















