বিরোধী জোটের লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে সরকারি দলের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না হলে লংমার্চের প্রয়োজন হতো না।
শনিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বগুড়া শহরতলীর মাটিডালি বিমান মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ৮ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কেন লংমার্চের ডাক দিলাম, এটা নিয়ে সরকারি দলের ঘুম হারাম। তারা বলছে, বিরোধী দল এত তাড়াতাড়ি লংমার্চ করে কেন? আমরা সরকারকে জিজ্ঞেস করতে চাই—ক্ষমতায় আসার আগেই জনগণকে অপমান করলেন কেন? ৭০ ভাগ জনগণ ভোট দিল ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। আপনারা যে ভোট চেয়েছিলেন, আমরাও সেই ভোট চেয়েছিলাম। আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? আপনারা যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করতেন, আজকে আমাদের লংমার্চ করার প্রয়োজন হতো না।”
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সংসদের তিনটি অধিবেশন চলে গেল। আপনারা জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার গঠন করেছেন, সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেননি কেন? আপনারা বলেছিলেন দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবেন। বলেছিলেন এক কোটি মানুষকে চাকরি দেবেন। অথচ আপনারা এক কোটি মানুষের হাতে চাঁদাবাজির চাবি তুলে দিয়েছেন। দুর্নীতির রেট বাড়িয়ে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এখন যিনি রাষ্ট্রপতি, তিনি বিএনপির মহাসচিব থাকাকালে বলেছিলেন, ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ এখন আমাদের স্লোগান হলো—‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ আমরা নতুন কোনো স্লোগান দিচ্ছি না। মির্জা ফখরুল ইসলাম যে স্লোগান দিয়েছিলেন, আমরা সেটাই দিচ্ছি।”
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, “আপনারা আমাদের সন্তানদের চাকরির অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন। দলীয় ক্যাডার-সন্ত্রাসীদের জায়গায় জায়গায় বসানোর জন্য রিটেনের মার্কের ডাবল করেছেন ভাইভার মার্ক। আমাদের সন্তানরা চাকরির অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য জীবন দিয়েছে। প্রয়োজনে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য আরেকবার জীবন দিতে প্রস্তুত। তবু এই বৈষম্য আমরা বরদাশত করব না।”
লংমার্চের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনারা জায়গায় জায়গায় প্রশাসক বসিয়ে মানুষকে শোষণ করছেন, আমরা বসে বসে আঙুল চুষব? এর জন্যই আমাদের লংমার্চ। আমাদের কৃষক বন্ধু সার পায় না। চৌদ্দশ টাকার সার কিনতে হয় ২ হাজার ২০০ টাকায়। এর জন্যই আমাদের লংমার্চ। ভাত দেওয়ার মুরোদ নাই, কিল মারার গোসাই। বিদ্যুৎ দিতে পারেন না, আবার ডাবল বিদ্যুৎ বিল দেন আপনারা।”
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো লোডশেডিং নেই। বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। গ্রামে বিদ্যুতের তার একটু লম্বা, এজন্য বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না। এরকম একজন অপদার্থ লোককে বিদ্যুৎমন্ত্রী বানিয়ে রাখা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এবারের লংমার্চ হয়েছে ঢাকা থেকে রংপুর। আগামীর লংমার্চ হবে পঞ্চগড় থেকে ঢাকায়।” এ সময় তিনি জনগণকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ঢাকা থেকে আসার পথে রাস্তায় শিশুরা চিৎকার করে বলছে, ‘দাদু, এক দফা, এক দফা।’ আমরা সরকারের কাছে ৮ দফা দাবি জানিয়েছি। এই ৮ দফা কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। যদি ৮ দফা না মানে, এক দফার জন্য প্রস্তুত থাকুন। যদি এক দফার ডাক দিতে হয়, তাহলে সবাই মিলে জনগণের বিজয় ছিনিয়ে আনব, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা থেকে আসার পথে রাস্তায় হাজার হাজার মা-বোন রাজপথে নেমে আমাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। চব্বিশের আন্দোলনে মা-বোনেরা রাজপথে নেমেছিল, সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। ছাব্বিশে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছে। ইনশাআল্লাহ, এই আন্দোলনও সফল হবে।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার নিখোঁজ সন্তানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন সর্বমন্ত্রী। তিনি সবকিছুই করেন, কিন্তু নিজের মন্ত্রণালয়ের খবর রাখতে পারেন না। সর্ষের মধ্যে থাকা ভূত জনগণের শান্তি কেড়ে নিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রয়োজনে জনগণের জন্য জীবন দেব, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না।”
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর শাখার আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল। অনুষ্ঠানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।



















