কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্বামী হত্যা মামলার বিচার চাওয়া ফাতেমা বেগম এখন ওই মামলার এক আসামির পরিবারের করা পালটা মামলায় আসামি হয়েছেন। অভিযোগ, সাজানো ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় ১৫ মাসের শিশুকে নিয়ে সাত দিন কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে।
ফাতেমার স্বামী মোহাম্মদ কাশেম ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নিহত হন। পরদিন ফাতেমা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় মো. রাসেলসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দেন, যেখানে মো. রাসেলকে হত্যাকারীদের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফাতেমার অভিযোগ, স্বামী হত্যা মামলা তুলে নিতে তাকে কয়েক দফা হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন। এর পর মো. রাসেলের মা নূর জাহান বেগম ফাতেমা ও তার পরিবারের আরও ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয় ফাতেমাকে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট নূর জাহান বেগম মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করেন, ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমাসহ সাতজন তাদের বাড়িতে হামলা চালান। এতে ঘরবাড়ি ভাঙচুর, মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগ করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করেন মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। ১০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হলেও সেখানে ফাতেমার স্বামী মোহাম্মদ কাশেমের হত্যাকাণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই। যদিও নথিতে কাশেমকে ফাতেমার স্বামী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুই পরিবারের বিরোধের মূল কারণই ছিল কাশেম হত্যা মামলা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাতেমা ও তার পরিবারের সদস্যরা দলবদ্ধভাবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে ঘরের দেয়াল, দরজা ও জানালা ভাঙচুর করেন এবং স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করেন। তবে মামলার কয়েকজন সাক্ষী দাবি করেছেন, তারা এমন কোনো ঘটনা দেখেননি এবং তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্যও দেননি।
মামলার সাক্ষী নূরুন্নাহার, মুন্নি আক্তার ও মোতাহারা বেগম বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা তারা দেখেননি। কীভাবে তাদের নাম সাক্ষী হিসেবে প্রতিবেদনে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না। তাদের দাবি, কাশেম হত্যার পর ক্ষুব্ধ লোকজন রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর করেছিল বলে তারা শুনেছেন।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা তার জানা নেই। তবে কাশেম হত্যার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল বলে তিনি শুনেছেন। তার মতে, কাশেম হত্যা মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই ফাতেমার পরিবারের বিরুদ্ধে পালটা মামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, এজাহার অনুযায়ী তিনি প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘর ভাঙচুর ও মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছেন, তবে কারা এসব করেছে তা তিনি জানেন না। রাসেলের বাড়িতে ফাতেমা ও তার পরিবারের লোকজনই ভাঙচুর করেছেন কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। ঘুষের বিনিময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
গত ৩১ আগস্ট ফাতেমা, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও নাসিমা আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রাশেদা ও নাসিমা জামিন পেলেও ১৫ মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে যেতে হয় ফাতেমাকে। মায়ের অনুপস্থিতিতে তার দুই মেয়ে রাজমিন আক্তার (চতুর্থ শ্রেণি) ও মিশকাত জান্নাতকে (প্রথম শ্রেণি) কয়েকদিনের জন্য এতিমখানায় রাখতে হয়।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। সাত দিন পর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
ফাতেমা বলেন, স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার ভাষ্য, “স্বামী হত্যার বিচার চাওয়াই কি আমার অপরাধ?” তিনি দাবি করেন, অন্যের বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করার মতো শক্তি, সামর্থ্য বা লোকবল তার নেই।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ওসি মো. সুলতান বলেন, ঘটনাটি তার যোগদানের আগে ঘটেছে, তাই তিনি বিস্তারিত জানেন না। তবে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে পুলিশ কাউকে হয়রানি করে থাকলে ভুক্তভোগী আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। আদালত বিষয়টি জানলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।



















