লালমনিরহাট, উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতোই লালমনিরহাটে ইরি ও বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় ধান কাটা-মাড়াই চলছে। তবে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে কিছু নিচু জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমিকের বাড়তি মজুরি, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও ধানের দাম কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। ভালো ফলনের পরও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সরেজমিনে জেলা সদরসহ পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাকা ধানে মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আভা। কৃষক ও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার কাজে। স্থানীয়দের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও শ্রমিকরা ধান কাটায় অংশ নিচ্ছেন।
তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। জানা গেছে, ২০২৫-২৬ বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই হিসেবে প্রতি মণ (প্রায় ৪০ কেজি) ধানের দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু স্থানীয় হাটে ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৬০ থেকে ৯০০ টাকায়। অন্যদিকে পানিতে ডুবে থাকা ধান কাটতে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কৃষকদের দাবি, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ প্রায় ১ হাজার টাকা হওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৪৮ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ২ লাখ ১ হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা সদরের বড়বাড়ীর হাটে ধান বিক্রি করতে এসে কৃষক সোলেমান মিয়া বাসসকে জানান, তার ক্ষেতের ধান কাটা প্রায় শেষ। বর্তমানে ধান শুকানো ও মাড়াই চলছে। কিছু ধান বিক্রির জন্য এনেছেন বাজারে। তবে সঠিক মূল্য না পেয়ে তিনি হতাশ।
ধান ব্যবসায়ী মানিক মহাজন বাসসকে বলেন, বর্তমানে বাজারে কাঁচা ধান প্রতি মণ ৮৬০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ধানের দাম আরও বাড়তে পারে।
বড়বাড়ী ইউনিয়নের কৃষক জাহিদ হোসেন (৪২) বলেন, ধান চাষ করাটা অভ্যাসের মতোই হয়ে গেছে। এই মৌসুমে এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ধান চাষে মোট ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার টাকা। আমার ক্ষেতে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা আছে। ১৮ মণ ধান ধরলে যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ ১৩ হাজার টাকা বাদে প্রায় ৩ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। দীর্ঘ ছয় মাস পরিশ্রমের তুলনায় এই আয় খুবই কম।
তিনি জানান, দুই একর (২০০ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করেও এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক মমিনুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির কারণে কিছু ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বেশি মজুরি দিয়ে ধান কেটে বাড়িতে আনতে হয়েছে।
আদিতমারী উপজেলার কৃষক বদিয়ার রহমান ও আব্বাস আলী সরকারের কাছে ধানের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ বাসসকে বলেন, বোরো চাষে কৃষকদের নিয়মিত সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন জানান, অনুকূল আবহাওয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে এ বছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। নতুন ধান বাজারে এলে চালের দামও স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ বাসস



















