প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও প্রবল বাতাসের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে শত শত দমকলকর্মী পানিবাহী বিমানসহ অভিযান চালাচ্ছেন। এর মধ্যে হাজার হাজার মানুষ এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আটলান্টিক উপকূলের হাজারো পর্যটককে ক্যাম্পসাইট ও অবকাশযাপন কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছে একটি শহরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া দাবানলের কারণে বৃহস্পতিবার রাতে বাসিন্দাদের ঘর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্য ব্যবস্থা (ইএফএফআইএস)-এর স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ বনভূমি পুড়েছে, তা রেকর্ডের দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে তিনজন দমকলকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, সহায়তার জন্য দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার (সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজম) সহযোগিতা চেয়েছে এবং ছয়টি অগ্নিনির্বাপক বিমান পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
ফ্রান্সের বোর্দো শহরের দক্ষিণে লে পোরজ এলাকার ৬৯ বছর বয়সী বাসিন্দা প্যাট্রিক মার্তিনো বলেন, ‘জেন্ডারমেরি (ফরাসি পুলিশ) এসে প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ছিল। আগুন প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ছিল। তাই আমরা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হই।’
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঐতিহাসিক গ্রাম কোটিনিয়াকের আশপাশে মিস্ত্রাল নামে পরিচিত প্রবল বাতাসের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকে সেখানে প্রায় ২৫টি বাড়ি পুড়ে গেছে।
ইতালিতে হাজারো জরুরি বিভাগের কর্মী সিসিলি ও কালাব্রিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বহু দাবানল নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছেন। কালাব্রিয়ার এক স্থানীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু আগুন নাশকতার কারণে লাগানো হয়েছে। আগুন ছড়ানোর জন্য দাহ্য তরলে ভেজানো কাপড় পথের বিড়ালের লেজে বেঁধে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিসিলিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় অসুস্থ হয়ে এক দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
বোর্দো এলাকার আশপাশে একটি উপকূলীয় পাইন বনে ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে বুধবার থেকে ২০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন পর্যটক। পর্যটকরা ক্যাম্পসাইট ও ভাড়া করা অবকাশযাপন কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনের উত্তর দিকের এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও দক্ষিণাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আঞ্চলিক দাবানল নিয়ন্ত্রণ প্রধান মার্ক ভারমুলেন বলেন, পর্যটনকেন্দ্র লেজ-ক্যাপ-ফেরেট রক্ষায় দমকলকর্মীরা এখন ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে’ আগুন মোকাবিলা করছেন।
বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে আরেকটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে মঙ্গলবার দুই দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
-কোনো সুযোগ নেই-
লে পোরজ এলাকার আকাশ ধোঁয়ায় কমলা রঙ ধারণ করেছে। পুড়ে যাওয়া পাইন গাছ থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর হেলিকপ্টারগুলো বারবার উচ্ছেদ করা এলাকাগুলোর ওপর দিয়ে উড়ছে।
২০২২ সালেও একই বনে ভয়াবহ দাবানলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
বিশ্ব আবহাওয়া বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তেল, কয়লা ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে খরার পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।
স্পেনের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদ্রিদের পশ্চিমে একটি ছোট শহরে বনাঞ্চলের আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে ৩ হাজার ৫০০ মানুষকে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, আলদেয়া দে ফ্রেসনো এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যসহ ১৮টি অগ্নিনির্বাপক ইউনিট কাজ করছে। এর আগে বুধবার টলেডো শহরের কাছে আরেকটি দাবানলের কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
দমকলকর্মীরা সারারাত কাজ করার পর বৃহস্পতিবার অধিকাংশ বাসিন্দাকে ঘরে ফিরতে দেওয়া হয়েছে।
তবে মাদ্রিদের উত্তরে গুয়াদালাহারা প্রদেশে আরও বড় একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে শত শত দমকলকর্মী ও সেনা সদস্য এখনো কাজ করছেন।
স্পেনের বেসামরিক সুরক্ষা প্রধান ভার্জিনিয়া বারকোনেস স্প্যানিশ রেডিওকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনই আমাদের গ্রাম, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, কিছু আগুন এত তীব্র হয়ে ওঠে যে, অগ্নিনির্বাপক বিমান ও মাঠপর্যায়ের কর্মী নিয়োগ করেও তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে; অনেক ক্ষেত্রে দমকলকর্মীরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন।
বারকোনেস জানান, গুয়াদালাহারায় ছড়িয়ে পড়া আগুনের পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে প্রবল বাতাস ও চরম তাপমাত্রার কারণে এখনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।



















