ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অচলাবস্থার মধ্যে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী রোববার আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি এখনও ‘দূরে’।
পাকিস্তানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায়, মধ্যস্থতা অব্যাহত রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় খুলতে দেবে না।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ শনিবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হয়েছে, তবে ‘অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে এবং কিছু মৌলিক বিষয় এখনও অমীমাংসিত।’
তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত আলোচনার পর্যায় থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে।’
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলা আলোচনায় তিনি তেহরানের অন্যতম আলোচক।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নবায়ন না করা হলে, তা বুধবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে।
তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে ফেলার চেষ্টা না করতে তেহরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
শুক্রবার তেহরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ থামাতে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এতে বৈশ্বিক বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে ও তেলের দাম কমে যায়। তবে ট্রাম্প জানিয়ে দেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে। এর পরই তেহরান সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তুললে, হরমুজ প্রণালীতে চলাচল অবশ্যই সীমিত থাকবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি লিখিত বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করতে ইরানের নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ‘কৌশলী আচরণ’ করছে।
তিনি আবারও তেহরানকে প্রণালী নিয়ে অবস্থান বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চাপের মুখে ফেলার’ চেষ্টা না করতে সতর্ক করেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদেরকে তিনি বলেন, আমরা খুব ভালো আলোচনা করছি এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘কঠোর অবস্থানে’ রয়েছে।
-‘টার্গেট করা হবে’-
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস সতর্ক করেছে, অনুমতি ছাড়া প্রণালী পার হওয়ার যে কোনো ধরনের চেষ্টা, ‘শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা’ হিসেবে গণ্য করা হবে ও সংশ্লিষ্ট জাহাজকে টার্গেট করা হবে।
শনিবার সকালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রণালী খোলার সময় কয়েকটি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার পার হয়। তবে পরে অনেক জাহাজ সরে যায় এবং বিকেলের দিকে প্রায় কোনো জাহাজ চলাচল করেনি।
যুক্তরাজ্যের একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, রেভল্যুশনারি গার্ডস একটি ট্যাংকারে গুলি চালিয়েছে।
নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড টেক জানায়, উপসাগর ছাড়তে থাকা একটি খালি ক্রুজ জাহাজকে ধ্বংসের হুমকি দেওয়া হয়।
তৃতীয় এক ঘটনায় যুক্তরাজ্যের সংস্থাটি জানায়, একটি জাহাজ অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এতে কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আগুন লাগেনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রণালীতে ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজকে লক্ষ্য করে ‘গুলির ঘটনা’ নিয়ে তারা ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
-ফরাসি শান্তিরক্ষী নিহত-
কূটনৈতিক অঙ্গনে মধ্যস্থতায় যুক্ত মিশর আশাবাদী সুর দেখিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি শনিবার বলেন, কায়রো ও ইসলামাবাদ ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে’ একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
বড় একটি অচলাবস্থার কারণ ইরানের প্রায় অস্ত্রমানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত।
ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, ইরান প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হয়েছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই মজুত কোথাও স্থানান্তর করা হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা হস্তান্তরের বিষয়টি আলোচনায় কখনও ওঠেনি।
ধারণা করা হচ্ছে, গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ধ্বংসস্তূপের গভীরে এই মজুত চাপা পড়ে আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ব্যাপক হামলা চালায়।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
দ্রুতই সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে ইরান হামলা চালায়।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ রকেট হামলার মাধ্যমে লেবাননকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।
শনিবার লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত ও তিন জন আহত হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এর জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করেন। যদিও সংগঠনটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইসরাইলের সেনাবাহিনী জানায়, শুক্রবার শুরু হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির পর, দক্ষিণ লেবাননে তাদের আরও দুই সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।]



















