শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:২১ পূর্বাহ্ন
মাইনুল ইসলাম রাজু, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
ভিক্ষুক পুনর্বাসনের আওতায় গরু পেয়ে দুই পা হারোনো প্রতিবন্ধী সিরাজ (৬২) কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘মুই এহন এট্টু বাঁচতে পারমু’। এতদিন ভিক্ষা কইরযা খাইতাম এহন আর ভিক্ষা করমু না। সিরাজের মত একই কথা বললেন গুলিশাখালী গ্রামের স্বামী পরিত্যাক্ত ভিক্ষুক মীম আক্তার (৩২)। এভাবে গুরু পাওয়া প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক আমিনুল , দোকান পাওয়া ফজলুল করিম (৫৫) ও আরিফা বেগম। গরু ও দোকান পেয়ে সবার মুখেই যেন এখন আনন্দ অশ্রু।
বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে ভিক্ষুকদের হাতে যখন গরুর দড়ি তুলে দেন আমতলীর ইউএনও মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী তখন সব ভিক্ষুকরাই যেন তাদেও বাঁচার ভরসা পেয়েছেন বলে কেউ কেউ হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন।
আমতলী উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে ভিক্ষুক মুক্ত আমতলী উপজেলা গড়ার প্রত্যয়ে দুর্ঘটনায় আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের দুই পা হারানো ভিক্ষুক সিরাজ, গুলিশাখালী গ্রামের স্বামী পরিত্যাক্ত অসুস্থ মীম, চাওড়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম,গোছখালী গ্রামের নাজমা বেগম এই চারজন ৩০হাজার টাকা করে ১লক্ষ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু এবং এক নম্বর ওয়ার্ডের অরিফা বেগম ও কেওয়াবুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিম দোকান পেয়ে আবেগ আপ্লুতের পর মহা খুশি।
আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের সহায় সম্বলহীন সিরাজ ২০২০ সালে এক দুর্ঘটনায় দুটি পা হারান। এর পর থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য হুইল চেয়ারে বসে আমতলী শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা বৃত্তি করে জীবন চালাতেন। একই অবস্থা গুলিশাখালী গ্রামের মীম আক্তারের। বিয়ের পর পেটে সন্তান থাকা অবস্থায় স্বামী আনিস নিরুদ্দেশ হন। শারিরিক অসুস্থ মীম ঝিএর কাজসহ ভিক্ষা করে মেয়ের এবং নিজের জীবন চালাতেন।
চাওড়া গ্রামের আমিনুল ইসলামও দুর্ঘটনায় একটি পা হারান। চিকিৎসা করাতে তিনি নি:স্ব হয়ে এক পর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ভিক্ষুকের পেশা বেছে নেন। গোছখালী গ্রামের নাজমা বেগমের একই অবস্থা। অসুস্থ শরীরে সংসার চালানোর মত কেউ না থাকায় ভিক্ষা করে জীবন চালাতেন। পৌরসভার ওয়াপদা সড়কের আরিফা ও কেওয়াবুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিমও অসহায় হয়ে ভিক্ষা করে জীবন চালাতেন।
দোকান পেয়ে কেওয়া বুনিয়া গ্রামের ফজলুল করিম বলেন, বাবা বয়সের ভারে এহন আর ভিক্ষা হরতে পারি না। ভিক্ষা হরতে না পারলে হে দিন না খাইয়া থাহোন লাগে। এহন বাচার এট্টু ভরসা পাইছি।
আরিফা বেগম বলেন, ভিক্ষা ছাড়া মোর কোন উহায় আছিল না। স্যারেরা মোরে এহন বাছার পথ কইরযা দেছে। আল্লায় যেন হেগো ভালো রাহে।
চাওড়া গ্রামের আমিনুল বলেন, মুই গরুডারে পাইল্যা ব্যামালা গরু বানামু। হেইয়ার পর মুই দুধ বেইচ্যা খামু।
চলতি বছর আমতলী উপজেলা প্রশাসন ৬জন ভিক্ষুকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। এবং আবেদনের ভিত্তিতে এই ছয়জনকে বাছাই করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্বাসনের জন্য ৪জনকে প্রতিটি ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু ও দুজনকে প্রত্যেকে ২৫ হাজার টাকা করে দুটি মুদি ও মনোহরি দোকান দিয়ে পুনর্বাসন করেন।
আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক বলেন, অনেক আবেদনের মধ্যে থেকে সরেজমিন বাছাই করে ৬জন ভিক্ষুকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ভিক্ষুক মুক্ত আমতলী উপজেলা গড়ার প্রত্যয়ে এ পর্য়ায়ে ৬জন ভিক্ষুকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে এবছর আরো কিছু ভিক্ষুক পুনর্বাসন করা হভে বলে আসা করছি।
2025 © জনপদ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রয়োজনে যোগাযোগঃ ০১৭১২-০৬৮৯৫৩