মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ মাসের পর মাস চলতে পারে। এতে তেলের দাম চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে, যা বৃহস্পতিবারও স্থির ছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা একাধিকবার শুরু হয়ে ভেস্তে যাওয়ার পর, কূটনীতি এখন অচলাবস্থায়। এর মধ্যে বুধবার ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।
পুতিন সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে, তার ‘ক্ষতিকর পরিণতি’ হবে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
তেল খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বন্দর অবরোধ বোমা হামলার চেয়ে বেশি কার্যকর। তেহরান যে কোনো চুক্তির আগে এই অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ( সেন্টকম) বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে জানায়, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা ৪২তম বাণিজ্যিক জাহাজকে সফলভাবে ঘুরিয়ে দিয়ে তারা একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ অর্জন করেছে।
তাদের দাবি, বর্তমানে ৪১টি ট্যাংকারে থাকা ৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরান বিক্রি করতে পারছে না, যার মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে আছেন। এই যুদ্ধ তার সমর্থকদের বড় অংশের কাছেও জনপ্রিয় নয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি খরচ বেড়েছে ও মিত্র দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবারের এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘বৈশ্বিক তেল বাজার স্থিতিশীল রাখা ও প্রয়োজন হলে, মাসের পর মাস অবরোধ চালিয়ে যাওয়া, একই সঙ্গে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রভাব কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
তেলের দাম চার বছরের সর্বোচ্চের কাছাকাছি রয়েছে। জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট একদিন আগে ১২২ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠে যায়।
বৃহস্পতিবার তা প্রায় ১২০ ডলারে স্থির ছিল। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ছিল প্রায় ১০৮ ডলার।
ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছে।
এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বে মোট তেলের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ পরিবাহিত হয়।
-‘মূল বিষয় সবসময়ই পারমাণবিক’—
বুধবার ট্রাম্প জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের সমালোচনা করেন।
বার্লিন ইরান যুদ্ধ সমর্থন না করায় এবং হরমুজ প্রণালীতে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ না নেওয়ায়, জার্মানিতে মার্কিন সেনা সংখ্যা কমানোর হুমকি দেন ট্রাম্প।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে দুই বার পাকিস্তান সফরের পথে ফিরে আসেন। তারা ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে যাচ্ছিলেন। তবে ট্রাম্পের কূটনৈতিক আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তেহরান।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের পক্ষে আসলে কারা কথা বলছে, সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত নন। তারা কঠোরপন্থী রেভল্যুশনারি গার্ড নাকি কূটনীতিক, তা জানেন না।
ইসরাইলি হামলায় একাধিক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সতর্ক করেছে, এই যুদ্ধ ও সারমূল্য বৃদ্ধির ফলে ১৬০টি দেশে ৩ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্যের শিকার হতে পারে। সংস্থাটির প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্র বলেন, ‘এটি উন্নয়নের উল্টো যাত্রা।’
কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও, ইরানের মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে গেছে।
প্যারিসে এএফপির সঙ্গে কথা বলা তেহরানের বাসিন্দারা হতাশার কথা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫২ বছর বয়সী এক স্থপতি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যতবার আলোচনা হয়েছে, মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তত খারাপ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে বা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মূল বিষয় সব সময়ই পারমাণবিক। মানুষের জীবন, অর্থনীতি বা স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা হয় না। মানুষ এখন ‘আলোচনা’ শব্দটিও শুনতে চায় না।’
—‘ধস’ ঠেকাতে লড়াই—
ওয়াশিংটন অবরোধ প্রত্যাহার করলে ও বৃহত্তর আলোচনা শুরু হলে হরমুজ প্রণালীতে চাপ কিছুটা শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ প্রস্তাবে সন্দিহান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের লক্ষ্য দেশটিকে বিভক্ত করা ও ভেতর থেকে ধস নামানো।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলেও লেবানন সীমান্তে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে ইসরাইল হামলা ও স্থল অভিযান চালায়।
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর প্রথমবারের মতো মঙ্গলবার লেবাননের সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণে ইসরাইলি হামলায় তাদের দুই সেনা আহত হয়েছেন।
বুধবার আরেক হামলায় এক সেনা নিহত হন।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিরাপত্তার একমাত্র পথ আলোচনা। তবে তার আগে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসরাইলি হামলা এভাবে চলতে পারে না।’
জাতিসংঘ-সমর্থিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে লেবাননে ১২ লক্ষাধিক মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে।
সূত্রঃ বাসস



















