রাজধানীর প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো এখন দূরপাল্লার বাসের অবৈধ কাউন্টার ও বেপরোয়া চলাচলের কারণে যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টার্মিনালের বাইরে গড়ে ওঠা এসব কাউন্টার ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অনিয়মের অভিযোগ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবহন কোম্পানির নামে গড়ে উঠেছে অবৈধ কাউন্টার নেটওয়ার্ক। এসব কাউন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগে মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অথচ এসব পরিবহন মালিকের প্রত্যেকেরই নির্ধারিত বাস টার্মিনালে বৈধ কাউন্টার রয়েছে।
সরকার যানজট কমাতে ঢাকার বাইরে স্থায়ী ও অস্থায়ী বাস টার্মিনাল এবং ডিপো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকা এই কাউন্টার ব্যবসা সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গত ৫ এপ্রিল নগরীর ভেতরের অনুমোদনহীন সব আন্তঃজেলা নাইট কোচ কাউন্টার অপসারণে সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিল।
এরপর গত ১৫ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবহন মালিক সমিতি ও বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে শর্তসাপেক্ষে এসব কাউন্টার সরাতে তিন মাস সময় বাড়ানো হয়। শর্ত ছিল, কাউন্টার থেকে টিকিট দেওয়ার পর যাত্রীদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মূল টার্মিনালে নিয়ে যেতে হবে এবং দূরপাল্লার বাস সরাসরি এসব কাউন্টারে দাঁড়াতে পারবে না। তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহাম্মেদ খোকন বলেন, ‘অন্যায় করা বা নিয়ম ভাঙা আমাদের দীর্ঘদিনের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি বাস ব্যানারেরই টার্মিনালে কাউন্টার রয়েছে; কিন্তু মালিকদের চাপের কারণে আমরা এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক এসব হটলাইন কাউন্টারগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরিচালনা করেন। পূর্বে (এপ্রিল) এসব কাউন্টার বন্ধ করা হয়েছিল; কিন্তু গত ঈদের আগে সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার পর পুরো উদ্যোগটিই ভেস্তে যায়।’ তার ভাষ্য, একসময় এসব কাউন্টারে তালা দেওয়া হলেও পরে তিন মাসের জন্য শিথিল করা হয়। এরপর কাউন্টারগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে নাকি চালু থাকবে, সে বিষয়ে আর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ ঘুরে দেখা গেছে, আব্দুল্লাহপুর থেকে আজমপুর প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন আন্তঃজেলা বাসের ৯০ থেকে ৯৫টি কাউন্টার রয়েছে। এছাড়া গাবতলী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, জুরাইন, কমলাপুর, আরামবাগ, ফকিরাপুল, পান্থপথ, কলাবাগান ও শ্যামলীতে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ কাউন্টার।
এসব কাউন্টার থেকে রাস্তার ওপর বাস দাঁড় করিয়ে টিকিট বিক্রি ও যাত্রী ওঠানো হয়। অধিকাংশ কাউন্টারের বৈধ অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত আসনের টিকিট বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক বাস মূল সড়কে অবস্থান করায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ফুটপাত দখল করে মালপত্র রাখায় পথচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কর্মী মো. আবুল বাশার বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার এসব কাউন্টার থেকেই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের টিকিট পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের অনেক পরিবহন ২৪ ঘণ্টা এসব স্থান থেকে চলাচল করে এবং কিছু গাড়ি সরাসরি এখান থেকেই আন্তঃজেলা সার্ভিস পরিচালনা করে।
ইউনিক কাউন্টারের কলারম্যান মিজানুর রহমান জানান, নির্ধারিত টার্মিনালের বাইরে এসব কাউন্টার থেকে টিকিটের দামে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য থাকে। তবে গন্তব্য অনুযায়ী এই ব্যবধান ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
যাত্রীরা বলছেন, টার্মিনালের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেই অনেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে হলেও রাস্তার পাশের কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতে বাধ্য হন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য টার্মিনালে স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ না থাকায় তারা এসব কাউন্টারকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন।
আব্দুল্লাহপুরে দায়িত্বরত ট্রাফিকের টিআই আরাফাত আহমদ বলেন, সাধারণ সময়ে কাউন্টারগুলোর ভাড়া বা অন্য কোনো বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নির্দেশনা থাকে না। তবে ঈদের সময় বিআরটিএ থেকে ভাড়ার চার্ট দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেন।
তিনি জানান, গ্রিন লাইন, সোহাগ, হানিফ, শ্যামলী বা স্টার লাইনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বড় কাউন্টার রয়েছে। তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো একটি কক্ষে কয়েকটি টেবিল নিয়ে এজেন্ট হিসেবে একাধিক কোম্পানির টিকিট বিক্রি করে। তার ভাষ্য, আব্দুল্লাহপুরে ২৮টি পরিবহন তাদের ব্যানারে কাউন্টার দিয়েছে। তবে সাব-কাউন্টারসহ প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সিকদার বলেন, পরিবহন মালিকরা কাউন্টারগুলো নির্ধারিত টার্মিনালের ভেতরে নিতে চাইলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তার অভিযোগ, অতীতে সিটি করপোরেশন দুবার এসব কাউন্টার উচ্ছেদ করলেও পরে আবার চালু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রভাবশালী মহলের তদবির ও নানা সমঝোতার কারণে প্রশাসন অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। এর ফলে প্রকৃত পরিবহন মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার মতে, পুলিশ ও সিটি করপোরেশন আন্তরিকভাবে কাজ করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এসব অবৈধ কাউন্টার বন্ধ করা সম্ভব।
প্রশাসন ও পরিবহন নেতাদের একাংশের দাবি, সরকার বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে থাকলেও বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপ ও নানা সমঝোতার কারণে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।



















