দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার পল্লীতে মনিরুজ্জামান রিফাত (৩৫) কাঠলিচু বা লটকন চাষে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছেন।
গতকাল সোমবার সরেজমিন জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার জোতকৃষ্টপুর গ্রামে মনির উদ্দিনের পুত্র উদ্যোক্তা যুবক মনিরুজ্জামান রিফাতের (৩৫) কাঠলিচু বা লটকন বাগানে গিয়ে তার সফলতার বিষয়ে আলাপকালে তিনি লটকন চাষে তার ব্যাপক সাফল্যের তথ্য বাসস’কে নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, চলতি বছরে দুই একর জমিতে ২ প্রজাতির শতাধিক গাছের লটকন প্রায় সাড়ে ১০ লক্ষ টাকা বিক্রি করেছেন। এসবের পাশাপাশি এবারই প্রথম তিনি তার বাগানে উৎপাদিত এক হাজার লটকন চারা বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত করেছেন।
রিফাত জানায়, জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের জোতকৃষ্টপুর গ্রামে তার নিজের পোল্ট্রি ফার্ম এবং লটকন ফলের বাগান করেছেন। তিনি একজন সফল পোল্ট্রি খামারি হিসাবে এলাকায় পরিচিত পেয়েছেন। তার খামারের নাম ‘মেসার্স প্রবাস বন্ধু পোল্ট্রি অ্যান্ড চকিস’। তার বাগানের লটকন এখন দেশের বাজারে ২শ’ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লটকন ফলের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের জেলা এবং উপজেলা গুলো।
তার লটকন বাগান ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ২ একর জমির চারপাশে শতাধিক লটকন ফলের গাছ। বাগানে প্রতিটি গাছেই লটকন ফল ধরেছে। এখানে ভিয়েতনামের দু’টি উন্নত জাত পিংকন এবং পিংপং চাষ করা হয়েছে। দেশে নতুন ও উচ্চ মূল্যের ফল হিসেবে এর চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করেছে।
দিনাজপুর হর্টিকালচার বিভাগের উপপরিচালক মো. এজামুল হক বাসস’কে জানান, সম্প্রতি তিনি লটকন চাষের সফল উদ্যোক্তা বিদেশ ফেরত যুবক মনিরুজ্জামান রিফাতের লটকন ফলের বাগান সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে এই ফলের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ কৃষকদের জন্য লাভজনক অবস্থার পথ খুলে দিতে পারে।
তিনি বলেন, দিনাজপুরে কয়েকটি উপজেলায় সীমিত পরিসরে লটকন চাষ শুরু করা হয়েছে। জেলার চিরিরবন্দর উপজেলায় এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে লটকন ফলের বাগান চাষে রিফাত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। লটকম গাছের ফল সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা চলমান রাখতে, উদ্যাক্তা যুবককে হর্টিকালচার বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত সহযোগিতা ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মনিরুজ্জামান রিফাত জানান, দীর্ঘদিন সে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করেছেন। সেখানেই প্রথম এই লটকন ফলের সাথে পরিচয় হয়।
তিনি বলেন, ‘আবুধাবিতে প্রায়ই ফলের ঝুড়িতে কাঠলিচু বা লটকন ফল দেখতাম। স্থানীয়রা খুবই আগ্রহ সহকারে এই ফল খেতেন। আমি সেখানে থাকাকালীন সময়ে প্রায় এই ফল খেয়েছি। তখন থেকেই এই ফল চাষের প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।
তিনি বলেন, দেশে ফিরে গত ২০২২ সালের জুন মাসে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেলডাঙ্গি গ্রামের মো. কামরুজ্জামান নামের একজনের নার্সারি থেকে ৫০টি উন্নত জাতের লটকন ফলের চারা সাড়ে ৩হাজার টাকায় ক্রয় করে নিয়ে এসেছিলাম। পরে ওই একই নার্সারি থেকে আরও ৭৫টি চারা সংগ্রহ করেন। নিজস্ব ২ একর জমিতে পোল্ট্রি খামারের চারপাশে এসব লটকন ফলের চারা গাছ লাগিয়েছি। মাত্র ৪ থেকে ৫বছরের পরিচর্যায় এখন প্রতিটি গাছে অধিক পরিমাণ ফল দিচ্ছে।
মনিরুজ্জামান বলেন, ‘গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার লটকন ফল বিক্রি করেছি। এবার যে পরিমাণ ফল এসেছে, তাতে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পেরেছি। বাগান দেখে অনেক কৃষক ও আশপাশের জেলার উদ্যোক্তা তরুণ ও যুবকরা লটকনের বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেকেই তার কাছ থেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আকার ভেদে প্রতি একশ’ লটকন ফলের চারা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। আমার কাছে বর্তমানে প্রায় এক হাজার চারা মজুত রয়েছে। এই চারা বিক্রি করে কমপক্ষে এক লাখ টাকা আয় করতে পারব। লটকন ফলের চারার চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছি না।
জেলার চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বাসস’কে বলেন, এই উপজেলায় প্রথম বিদেশ ফেরত এক উদ্যোক্তা যুবক বাণিজ্যিকভাবে লটকন বাগান করেছেন। বাগান চাষের ৪ থেকে ৫ বছর পর এবারে তার লটকন গাছে অধিক পরিমান ফল এসেছিল। লটকন, লিচু ও রাম্বুটান একই উদ্ভিদ জাতের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল বলে তিনি মন্তব্য করেন। এখানে যে ভিয়েতনামি পিংপং জাতের লটকন চাষ করা হয়েছে। তাতে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক খুবই কম। কম কীটনাশক ব্যবহার করেই নিরাপদে এই ফল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত উদ্যোক্তা যুবককে তার লটকন ফল চাষে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, তিনি সম্প্রতি জেলার চিরিরবন্দর উপজেলায় অবস্থিত উদ্যোক্তা যুবক মনিরুজ্জামান রিফাতের লটকন বাগানটি পরিদর্শন করেছেন। তার বাগানটি সফলতা সফলতা দেখা, তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে আরো যদি কোনো যুবক ও তরুণরা এ ধরনের ফলের বাগান করতে চায়, তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেয়ার জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করেছি।
সূত্রঃ বাসস



















