তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করানো, হালকা ও সুতির পোশাক পরানো, দিনে ২-৩ বার গোসল করানো এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ।
তারা জানান, প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু ও বয়স্করা। এ সময় তাদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং তাপমাত্রার প্রভাবও বেশি পড়ে। ফলে সামান্য অসাবধানতাও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই এ সময়ে তাদের প্রতি বাড়তি যত্ন ও সচেতনতা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের নিয়মিত পানি পান করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা তৃষ্ণা পেলেই পানি খাবে- এমনটা না ভেবে নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি বা তরল খাবার দিতে হবে। ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও ঘরে তৈরি ফলের রস এক্ষেত্রে বেশ উপকারী। গরমে শিশু ও বয়স্কদের সরাসরি রোদে বেশি সময় না রাখাই ভালো। বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরে না বের করাই নিরাপদ। প্রয়োজনে বের হলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক ও ছাতা ব্যবহার করা উচিত।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল কাদের বাসস’কে জানান, গরমে শিশুদের হিটস্ট্রোক, জ্বর, ডায়রিয়া, বমি ও পানিশূন্যতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তারা নিজের সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না, ফলে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হয়।
তিনি বলেন, শিশু ও বয়স্কদের ঘরের পরিবেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক রাখা উচিত। প্রয়োজনে ফ্যান বা এয়ার কুলার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সরাসরি ঠান্ডা বাতাসে দীর্ঘ সময় রাখা থেকেও বিরত থাকতে হবে। যদি শিশু ও বয়স্কদের শরীরে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হয়, মাথা ঘোরে, বমি হয় বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণ হিটস্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে।
খাবারের বিষয়ে আব্দুল কাদের বলেন, গরমে শিশু ও বয়স্কদের পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ঘোল বা লাচ্ছি খাওয়া ভালো। এতে পানিশূন্যতা দূর হয় এবং শরীরে শক্তি যোগায়। তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁপে, শসা ও কলার মতো সহজপাচ্য ও পানিসমৃদ্ধ ফল শরীর ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। নিয়মিত ভাত, ডাল, শাকসবজি, মাছ ও হালকা মসলার রান্না করা খাবার শিশুর জন্য উপকারী। টক দই হজমশক্তি বাড়ায় এবং শরীর সতেজ রাখে।
ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বাসস’কে বলেন, গরমে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ে। এ সময় বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেশি হওয়ায় বাইরের খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। ফুটপাতের শরবত, ফুচকা-চটপটি ও ভাজাপোড়ায় জীবাণুর ঝুঁকি থাকে, যা দ্রুত তাদের অসুস্থ করে তুলতে পারে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে বাসায় রান্না করা খাবারই সবার জন্য নিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত তেলযুক্ত ও ভারী খাবারের বদলে হালকা, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া উচিত। ফল, সবজি ও তরল খাবার বেশি খাওয়ানো ভালো। গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়, তাই সবসময় তাজা ও পরিষ্কার খাবার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা জরুরি।
ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান বাসস’কে জানান, আমরা ইতোমধ্যেই মিটিং করে স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের এসব পরামর্শ জানাতে বলা হয়েছে।
পরামর্শ গুলো হলো: প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। চা-কফি এড়িয়ে চলা ভালো। খুব প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়া, বাইরে গেলে হালকা সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং অবশ্যই ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করা। স্যালাইন বা ডাবের পানি পান করে পানিশূন্যতা রোধ করতে হবে। শিশু ও বয়স্কদের ঘরের ভেতর রাখা এবং তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআর (IEDCR)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তীব্র গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শরীর ঠান্ডা রাখা এবং পানিশূন্যতা রোধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বেশি করে পানি ও তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে এবং দুপুরের কড়া রোদে ও চুলার কাছে কাজ করা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশু ও বয়স্কদের হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেশি থাকায় তাদের ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা এবং নিয়মিত পানি পান করানো জরুরি।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলাসহ রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। একইসঙ্গে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
সূত্রঃ বাসস



















