রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৮ অপরাহ্ন
জাবি প্রতিনিধি:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) শীত মৌসুম এলেই নিয়মিত আয়োজন করা হয় ‘হিম উৎসব’। একে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উৎসব ইতিবাচক আলোচনার চেয়ে বিতর্ক, সমালোচনা ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে বেশি। সংস্কৃতি চর্চার নামে আয়োজিত এই উৎসব ঘিরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, অশোভন পরিবেশনা, মাদক সেবন, মব সৃষ্টি এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা—এমন নানা অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।
চলতি বছরের হিম উৎসবকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় পবিত্র কুরআনের সূরা নাস পাঠ ও তার বিকৃত ব্যাখ্যা নিয়ে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি চত্বরে আয়োজিত পালাগানের এক পর্যায়ে এক বাউল শিল্পী সূরা নাসের কিছু অংশ অসম্পূর্ণভাবে পাঠ করে মন্তব্য করেন—“পুরা সূরা জুড়েই নাচতে বলা হয়েছে, যত নাচবি তত বাঁচবি।” এরপর তিনি নৃত্যসংক্রান্ত একটি গান শুরু করেন। এ বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের একাংশ তীব্র আপত্তি জানান এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুইজন শিক্ষার্থী মঞ্চে উঠে শিল্পীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানালে আয়োজক কমিটির সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে উল্টো প্রতিবাদকারীদের নামিয়ে দেন। শিল্পী তাৎক্ষণিকভাবে ভুল স্বীকার করলেও অনুষ্ঠান বন্ধ না করে পুনরায় বিতর্কিত পরিবেশনা চালু রাখা হয়। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী প্রতিবাদী দুই শিক্ষার্থীকে ঘিরে ধরে, যা এক পর্যায়ে মব পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ‘মৌলবাদী’, ‘তৌহিদি জনতা’ ও ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে ভিলিফাই করা হয় এবং জোরপূর্বক তাফসির জিজ্ঞেস করে হেনস্তা করা হয়।
এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শহীদ মিনার ও উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবিতে অবস্থান নেয়। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে জানান, প্রক্টরিয়াল টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে সংঘাত তৈরির ধারাবাহিকতা।
এবারের উৎসবের প্রথম দিনেও বিতর্ক সৃষ্টি হয় ‘পঞ্চরস যাত্রাপালা’ নামের একটি নৃত্য পরিবেশনাকে ঘিরে। তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের একজন শিল্পীর পরিবেশিত নৃত্যকে অনেক শিক্ষার্থী ‘অশোভন’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শালীনতার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন। সামাজিক মাধ্যমে নৃত্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা আরও তীব্র হয়। শিক্ষার্থীদের মতে, এ ধরনের পরিবেশনা বারবার আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ফেসবুক মন্তব্যকে ঘিরে। তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হাসান নাঈম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সূরা নাস ও সূরা ফালাক আল কুরআনের অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন বক্তব্য দেন। পরবর্তীতে তিনি এটিকে নিজের মত নয় বলে দাবি করলেও তার মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। একাধিক শিক্ষার্থী তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানান এবং একে ধর্মীয় উস্কানিকে তাত্ত্বিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
হিম উৎসবকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন বছরে উৎসব চলাকালে মাদক সেবনের অভিযোগে বহিরাগতসহ শিক্ষার্থীদের আটক করেছে প্রক্টরিয়াল টিম। ২০১৯ সালে মুক্তমঞ্চ এলাকায় মাদক সেবনের সময় ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১০ জনকে আটক করা হয়। তখন প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বাস্তবে হিম উৎসব ঘিরে মাদক সেবনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
এছাড়া গত বছর হিম উৎসব চলাকালে নারী হল থেকে বহিরাগত যুবক আটক হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল থেকে এক যুবক আটক হন, যিনি হিম উৎসব দেখতে এসে এক নারী শিক্ষার্থীর সহায়তায় হলে প্রবেশ করেছিলেন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের শাস্তি হলেও উৎসবের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ক্যাম্পাসের একাংশ শিক্ষার্থীর মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বামপন্থী সংগঠনগুলোর বিপর্যয়ের পর হিম উৎসবকে ঘিরে তারা আরও ‘ডেসপারেট’ হয়ে উঠেছে এবং সংস্কৃতির নামে ফ্যাসাদ তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বামপন্থী নেতারা দাবি করছেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কিছু শিক্ষার্থী পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান বানচাল করতে চেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের ৪৮ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হাসান সজীব তার সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, এবারের আয়োজনটাই ছিল কন্ট্রোভার্সি ক্রিয়েট করার পায়তারা। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিদের দিয়ে নোংরা নাচ নাচিয়ে যখন খুব বেশি সমালোচনা ক্রিয়েট করা গেল না, তখন পরেরদিন ফের সেই সূরা নাসের ঘটনটা ঘটানো হইলো। যেই সিমিলার ঘটনা নিয়ে এর আগেও একটা ঝামেলা দেশব্যাপী হয়েছিল। তিনি আরও লেখেন, একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, গানের একই টপিক নির্ধারণ–এগুলা দেখে মনে হয়েছে সবকিছু ডেলিবারেটলি করা হয়েছে, প্ল্যানড ওয়েতে । সাধারণ/ধর্মপ্রাণ পোলাপানকে ট্রিগার করে সমালোচনা ইনভাইট করার চেষ্টা আছে এখানে। ইসলামপন্থী/সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে একটা ঝামেলা লাগুক, এই ইন্টেনশন রাইখাই আয়োজনের বিষয়বস্তু নির্ধারন করা।
জলসিঁড়ির সাবেক সভাপতি মো. ফেরদৌস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে “হিম উৎসব” এর এমন অসুস্থ রুচির আয়োজনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলাম।মুক্তমঞ্চ আমার কাছে বিশাল কিছু, পবিত্রতা, এখানে মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশ করা স্বপ্ন,সাধনা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে প্রমোদবস্তু বানিয়ে তৈরী হওয়া যাত্রাপালা(সেমিন্যুড) মুক্তমঞ্চে প্রদর্শন করা কোনো সুস্থ সংস্কৃতি হতে পারে না।হয় বিকৃত রুচি নয়তো রুচির দুর্ভিক্ষ বা অজ্ঞতা। আয়োজক নাকি”পরম্পরায় আমরা” এরা জাহাঙ্গীরনগরের কোন পরম্পরা,কার পরম্পরা, কত দিনের পরম্পরা প্রকাশ করে তা এখনো বোধগম্য নয় নয়।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৩দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বরাবর আবেদন প্রদান করেন একদল শিক্ষার্থী। দাবিগুলো- অবমাননাকারী আয়োজকদের এবং মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বারবার মাদক সেবনসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রমের দায়ে ‘হিম উৎসব এর আয়োজন বন্ধ করতে হবে অথবা প্রশাসনের সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধানে এ আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকে সমর্থনের দায়ে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক জনাব হাদ্যম নাঈমের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। কিছুক্ষন বাদে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। তখন সব জানতে পারবেন।
2025 © জনপদ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রয়োজনে যোগাযোগঃ ০১৭১২-০৬৮৯৫৩