অনুজা সাহা অ্যানি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজ থেকে এমএসসি পাস করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন শুধুমাত্র একটি চাকরির আশায়। কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি চাকরি নামের সেই সোনার হরিণ। একপর্যায়ে চাকরির আশা ছেড়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। অনুজা ভালো রান্না করতে পারেন। সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন খাবার বিক্রি।
এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। আজ তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। নিজে যেমন সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন, তেমনি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন আরও অনেক নারীর।
বলছি, পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার বাসিন্দা অনুজা সাহা অ্যানির কথা। যিনি তার উদ্যোগ দিয়ে ইতোমধ্যে বেশ আলোচিত হয়েছেন। তাকে অনুকরণ করছেন অনেক নতুন উদ্যোক্তা।
তারা বলছেন, চাকরির পেছনে না ছুটে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অনুজা। তিনি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহা দম্পতির একমাত্র সন্তান অনুজা ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপরই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। এর মধ্যেই কোলজুড়ে আসে একটি পুত্রসন্তান। এরপরও ঘরকন্না সামলে নিজ প্রচেষ্টায় চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
‘এর মাঝে স্বামী বিপ্লব কুমারের ব্যবসাও মন্দ যাচ্ছিল। ফলে সংসারে অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসে। এমতাবস্থায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি,’ বলছিলেন অনুজা।
তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা করেছি। সংসারের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই পত্রপত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখলেই আবেদন করেছি। কিন্তু সেভাবে কোনো গতি করতে পারিনি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী উদ্যোক্তাদের গল্প পত্রিকার পাতায় দেখেছি। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প পড়ে আমি বেশ উদ্বুদ্ধ হয়েছি। একপর্যায়ে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করি।’
যেই কথা সেই কাজ। মায়ের সহযোগিতায় এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করেন রান্না করা খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস। এভাবে আস্তে আস্তে অর্ডার বাড়তে থাকে।
‘অর্ডার বেশি দেখে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। শুরু করি বড় আকারের ব্যবসা,’ বলেন তিনি।
অনুজার ভাষ্য, এরপর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। গত ১৪ বছরে খাবারের এই ব্যবসায় নিজে যেমন আয় করেছেন, তেমনি সম্মানও অর্জন করেছেন। অনেকের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়েছে, যা তার কাছে অন্যরকম ভালো লাগা ও তৃপ্তির বিষয়।
তিনি জানান, ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। পুঁজির পরিমাণও বেড়েছে। সংসার খরচ চালিয়ে ও কর্মচারীদের বেতন দিয়ে মাস শেষে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় হয়।
এখানেই থেমে নেই অনুজা। বিসিক, যুব উন্নয়ন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। এর মধ্যে ‘মায়ের পরশ’ নামে একটি রেস্টুরেন্টও চালু করেছেন। স্বল্পমূল্যে খাবার বিক্রি করে দরিদ্র মানুষের কাছেও পরিচিতি লাভ করেছেন তিনি।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে অনুজা বলেন, ‘মা প্রথমে ব্যবসা করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সংসারজীবনের নির্মম বাস্তবতার কষাঘাতে আমি যখন জর্জরিত, তখন মা সম্মতি দেন।’
উদ্যোক্তা অনুজার মা ছিলেন সুদক্ষ রাঁধুনি। তার কাছেই রান্না শিখে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করে পরিচিতি পান অনুজা। হোম ডেলিভারি সার্ভিস থেকে নানা ধরনের পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি আইটেম, সাদা ভাত ও বিরিয়ানি সরবরাহ শুরু হয় পাবনা অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায়।
তিনি বলেন, ‘গত ১৪ বছর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সবার দোয়া-ভালোবাসায় ব্যবসা করে যাচ্ছি। উদ্যোক্তা মেলায় অংশ নিয়েছি। নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনি আমার সঙ্গে এখন অন্তত ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে এই নারী বলেন, ‘সামনে ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে চাই। আর আগ্রহী উদ্যোক্তা মেয়েদের বলব, কোনো কাজই ছোট নয়। ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না। পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, তবেই সফলতা আসবে।’
অনুজার সাফল্যে বেজায় খুশি স্বামী বিপ্লব কুমারও। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমরা দু’জনই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন অনুজা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। প্রথমদিকে আমি ভয় পেয়েছিলাম— পারবে তো? ধীরে ধীরে ব্যবসা ভালো চলায় তার পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে পাবনাবাসীকে আরও ভালো মানের খাবার সরবরাহ করতে চাই।’
অনুজার উদ্যোগের বিষয়ে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী কামাল সিদ্দিকী বলেন, ‘অনুজার লড়াই শুরু থেকেই দেখছি। পড়াশোনা করে চাকরির স্বপ্ন পূরণ না হলেও অনুজা মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখভাল করছেন। সমাজে আর দশজন নারীর জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। বিন্দু থেকে সিন্ধুতে পরিণত হয়েছেন তিনি। এটা আমাদের জন্য গর্বেরও বিষয়।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পাবনা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহার জলি বলেন, ‘অনুজা একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তাকে দেখে পাবনার অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন। তার পাশে বাবা-মা ও স্বামীও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’
‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তিনি একজন অনুকরণীয় নারী। নারীরাও এ দেশে আর পিছিয়ে নেই। তার মতো অন্যান্য নারীও সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে— এই প্রত্যাশা করি,’ বলেন তিনি।
সূত্রঃ বাসস



















