রাতের খাবারের আয়োজন করছিলেন স্বামী-স্ত্রী। সেটাই কাল হলো তাদের । রান্নাঘরে যেতেই ধসে পড়লো পাহাড়। পাহাড় ধসে স্বামী অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেও মাটিচাপায় প্রাণ গেল স্ত্রী রোজিনা বেগমের।
গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার শহরের পূর্ব কলাতলী ঝরঝরি পাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর তার মরদেহ উদ্ধার করে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, টানা বৃষ্টিতে জেলার পাহাড়গুলো এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বারবার সতর্ক করা হলেও জীবিকার তাগিদে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে পাহাড় ধস ও প্রাণহানির আশঙ্কা।
রাতের খাবার একসঙ্গে খাওয়ার কথা ছিল আব্দুল মজিদ ও তার স্ত্রী রোজিনা বেগমের। খাবারের আয়োজন করতে পাহাড়ের পাশে রান্নাঘরে ঢুকতেই ভারী বৃষ্টির মধ্যে ধসে পড়ে পাহাড়। স্বামী সামান্য আহত হয়ে প্রাণে বাঁচলেও মাটিচাপায় নিহত হন রোজিনা। মুহূর্তেই আনন্দের অপেক্ষা পরিণত হয় স্বজনদের আহাজারিতে।
রোজিনা বেগম (৪০) এর স্বামী আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমি বারবার ওকে বলেছিলাম, পাহাড়ের পাশের রান্নাঘরে না যেতে। বলেছিলাম, বৃষ্টি বেশি, পাহাড় ধসে যেতে পারে। কিন্তু রান্না করতে রান্নাঘরে যেতেই মুহূর্তেই ধস নামে। আমি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও আমার স্ত্রী মাটিচাপা পড়ে মারা যায়।’
তিনি বলেন, ‘এর আগেও পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির লোকজনকে বলেছিলাম, যেন পানি না ফেলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশগুলো কেটে ফেলে। কিন্তু কেউ কথা শোনেননি। ঘটনার সময় আমি ও আমার স্ত্রী পেছনের ঘরে, আর বাবা ও আমার ছোট মেয়ে সামনের ঘরে ছিলো।’
স্বজনদের দাবি, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের অভিযোগ, পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির জন্য মাটি ভরাট করায় ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছিল। বারবার সতর্ক করলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। পাহাড়ধসের পর চিৎকার করেও সময়মতো সহযোগিতা মেলেনি। আর সেই ধসেই প্রাণ হারান রোজিনা বেগম।
আব্দুল মজিদের ভাই আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমরা ১৯৯১ সাল থেকে এখানে বসবাস করছি। এতদিন কখনও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সম্প্রতি পাহাড়ের ওপরে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি ভরাট করায় ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আমরা বারবার সতর্ক করলেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। অন্তত পাহাড় ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো ধস নামত না, আর আমার বোনকেও প্রাণ হারাতে হতো না।’
ফায়ার সার্ভিস জানায়, রোজিনা বেগম রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট। তাদের সহযোগিতা করেন স্থানীয়রা।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ‘রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড় ধসে একজন নারী মাটিচাপা পড়েছেন- এমন খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকায় ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, ওই নারী রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। টানা বৃষ্টির এই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান না করার জন্য তিনি সবাইকে আবারও অনুরোধ জানান।
এদিকে কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ২১ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে পেকুয়া সদর ইউনিয়ন মেহেরনামা ৮নং ওয়ার্ড বলিরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মারা যাওয়া শিশুর নাম মুশফিকুর রহিম। সে ওই এলাকার সৌদি (প্রবাসী) মো. নাছিরের পুত্র। তার মৃত্যুর বিষয়টি পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মেহেদী হাসান নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারের সদস্যদের অগোচরে শিশুটি বন্যার পানিতে ডুবে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।



















