রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন
ফিলিস্তিনের গাজায় শনিবার ইসরাইলি বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা। অপরদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হামাসের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চলতি মাসের শুরুতে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করলেও গাজায় সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় ইসরাইল ও হামাস একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
সর্বশেষ এই রক্তপাতের ঘটনা এমন এক সময় ঘটল, যখন ইসরাইল রোববার গাজা ও মিসরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ ক্রসিং ‘সীমিত সংখ্যক মানুষের চলাচলের’ জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
গাজা থেকে এএফপি জানায়, গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানায়, ‘আজ ভোর থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।’ এর আগে নিহতের সংখ্যা ২৮ বলা হয়েছিল।
সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট, তাঁবু, আশ্রয়কেন্দ্র এবং একটি পুলিশ স্টেশন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।’
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, গাজা সিটির রিমাল এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের একটি ইউনিট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নিচের রাস্তায় রক্তের ছোপ দেখা গেছে।
নিহত পরিবারের এক সদস্য সামের আল-আতবাশ এএফপিকে বলেন, ‘তিনটি মেয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা গেছে। আমরা তাদের মরদেহ রাস্তায় পেয়েছি।’
আরেক স্বজন নায়েল আল-আতবাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোন যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন? সবাই সবাইকে প্রতারণা করছে।’
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় নগরকেন্দ্রে একটি পুলিশ স্টেশনেও হামলা চালানো হয়।
গাজার সাধারণ পুলিশ অধিদপ্তর জানায়, ওই হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। তবে মাহমুদ বাসসাল বলেন, নিহতদের মধ্যে চারজন নারী পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভবন থেকে মরদেহ উদ্ধারে অন্তত এক ডজন উদ্ধারকর্মী ছুটে যান।
আরেকটি ইসরাইলি হামলা দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আঘাত হানে। সেখানে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
হাজারো ঘনভাবে স্থাপিত তাঁবুর ওপর দিয়ে ধোঁয়ার বড় বড় কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। এ হামলায় হতাহতের সংখ্যা তখনো জানা যায়নি।
যদিও ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পর প্রায় প্রতিদিনই গাজায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, শনিবারের হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে একটি সুড়ঙ্গ থেকে আটজন ফিলিস্তিনি যোদ্ধা বেরিয়ে আসার ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ঘটনা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।
সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের ‘চারজন কমান্ডার ও অতিরিক্ত সন্ত্রাসীকে’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য সুহাইল আল-হিন্দি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আজ যা ঘটেছে, তা একটি পূর্ণাঙ্গ অপরাধ। এটি এমন এক অপরাধী শত্রুর কাজ, যারা কোনো চুক্তি মানে না এবং কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখায় না।’
হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫০৯ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, একই সময়ে গাজায় সন্দেহভাজন সশস্ত্র হামলায় তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছেন।
গাজায় গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ এবং সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কিংবা সহিংসতার ঘটনাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কাভার করা এএফপির পক্ষে সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিসর ও কাতার ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে।
রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার আগে সব পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে মিসর। আর কাতার বলেছে, তারা ‘যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিক ইসরাইলি লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানাচ্ছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এই সহিংসতা ‘একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা’, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে এবং যুদ্ধবিরতি সুসংহত করার লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইসরাইল জানিয়েছে, রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলা হলেও সেখানে কেবল ‘সীমিত মানুষের চলাচল’ অনুমোদন দেওয়া হবে।
গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রাফাহ ক্রসিং পুনরায় চালু করা।
এর আগে ইসরাইল জানায়, গাজায় আটক শেষ জিম্মি রান গভিলির মরদেহ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা এই সীমান্তপথ খুলতে রাজি নয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং বুধবার ইসরাইলে দাফন সম্পন্ন হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় সরকারি ইসরাইলি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন।
এর জবাবে ইসরাইলি হামলায় গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০০৭ সাল থেকে আরোপিত ইসরাইলি অবরোধের পাশাপাশি আগের দফার সংঘাতেও অঞ্চলটি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দুই বছরের এই যুদ্ধে গাজায় অন্তত ৭১ হাজার ৭৬৯ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এসব পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
সূত্রঃ বাসস
2025 © জনপদ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রয়োজনে যোগাযোগঃ ০১৭১২-০৬৮৯৫৩