রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন
সানজানা তালুকদার, কুবি প্রতিনিধি:
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসে এখন ৩০ ও ৩১ জানুয়ারির ভর্তি পরীক্ষার চরম ব্যস্ততা। হাজারো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের পদচারণায় মুখর চারপাশ। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্ট আর গাছের ছায়ায় ঘেরা পথগুলো যেন এক নীরব অথচ শক্তিশালী ভাষায় কথা বলে উঠছে। এটি কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক প্রচার নয়; এটি এক শহিদের স্মৃতি সংরক্ষণ আর অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দাবির লড়াই।
শরীফ ওসমান বিন হাদি, যিনি ওসমান হাদি নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; ছিলেন একজন শিক্ষক, লেখক, প্রখর সাংস্কৃতিক কর্মী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র। জুলাই শহিদদের অধিকার রক্ষা, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে তাঁর সংসদ সদস্য পদে লড়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর বিজয় নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় জুমার নামাজের পর তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ভর্তি পরীক্ষার এই ডামাডোলের মাঝেই কুবি শাখার ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজন করেছে শহিদ হাদিকে ঘিরে এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। গাছে টাঙানো পোস্টারগুলোতে ফুটে উঠেছে হাদির মুখচ্ছবি এবং তাঁর তেজদীপ্ত বাণী। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে এমন এক মানুষের গল্প, যিনি ন্যায়ের পথে আপসহীন থেকে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের সময় অনেক পরীক্ষার্থীকেই থমকে দাঁড়াতে দেখা গেছে। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়ছেন পোস্টারে লেখা তাঁর জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। অনেকেই হয়তো হাদিকে আগে চিনতেন না, কিন্তু এই প্রদর্শনী তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে, কেন আজও এই বীরের হত্যার বিচার মেলেনি?
কুবি ইনকিলাব মঞ্চের আহবায়ক হান্নান রাহিম বলেন, “শহীদ উসমান হাদী আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের অগ্রসেনানী। তিনি দেশের মানুষের মাঝে বাংলাদেশপন্থী চেতনার বীজ বপন করে দিয়ে গেছে, আর বাংলাদেশের মানুষও তাকে তাদের হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পরে কিয়ামত পর্যন্ত যেন ইনসাফের লড়াই জারি থাকে। উসমান হাদীকে মানুষের মাঝে জীবিত করে তুলতে আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, তার জীবনী উপস্থাপন করা পাশাপাশি শহীদ হাদীর হত্যার বিচারের দাবী তোলা।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আজ কেবল একটি পরীক্ষাকেন্দ্র নয়, বরং হয়ে উঠেছে বিবেকের এক উন্মুক্ত মঞ্চ। যেখানে নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসা তরুণদের সামনে ন্যায়ের দাবিকে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা হয়তো ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু ওসমান হাদির সেই শান্ত অথচ দৃঢ় চাউনি আর ‘বিচার কবে?’ এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই স্থায়ী রেখাপাত করে যাবে।
শহিদ হাদির আদর্শ আর তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো যেন বিফলে না যায়, সেই বার্তাই আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কুবির প্রতিটি কোণায়।
2025 © জনপদ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রয়োজনে যোগাযোগঃ ০১৭১২-০৬৮৯৫৩