দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সমাপনীর সবচেয়ে বড় আসর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষা আগামীকাল ২১ এপ্রিল (মঙ্গলবার) সকাল ১০টা থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হচ্ছে।
এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৪২৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২১ হাজার ১১৮ জন। এবারের পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসমুক্ত, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শিক্ষা বোর্ডগুলো সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রথমবারের মতো প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ ‘একগুচ্ছ’ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার প্রথম দিন ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র এবং সহজ বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হবে। আর মাদ্রাসার কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা হবে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার এহসানুল কবির রোববার বাসসকে বলেন, ‘২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আয়োজনে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও পরীক্ষা চলাকালে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবার প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষা গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান: আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১৪ লাখ ১২ হাজার ৪৭৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৭ লাখ ৫১ হাজার ৯৩ জন।
বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৩৫ জন রয়েছে। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীতে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭০৯ জন; কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৬ জন; যশোর বোর্ডে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৯ জন; চট্টগ্রামে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৭৯ জন; বরিশালে ৮১ হাজার ৮৩১ জন; সিলেটে ৮৯ হাজার ১৯০ জন; দিনাজপুরে ১ লাখ ৮০ হাজার ৭০১ জন এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৯ হাজার ২৩৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার ৪৯১ জন এবং ছাত্রী ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৫ জন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ১ হাজার ৫০৯ জন এবং ছাত্রী ৩৩ হাজার ১৫১ জন।
সারা দেশে মোট ৩ হাজার ৯০২টি কেন্দ্রে ৩০ হাজার ৪২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান মতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৪২৩ জনে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের ৩০ হাজার ৪৫টি থেকে বেড়ে এ বছর ৩০ হাজার ৪২৫টিতে উন্নীত হয়েছে।
বিভাগ ও গ্রুপভিত্তিক পরিসংখ্যান: আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে মোট ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৩ জন; মানবিক বিভাগে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৪৫১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২ লাখ ২১ হাজার ১৮৪ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে সাধারণ বিভাগে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩২০ জন; বিজ্ঞান বিভাগে ৪১ হাজার ৫২১ জন এবং মুজাব্বিদ বিভাগে ৪৩৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ১ হাজার ৫০৯ জন এবং ছাত্রী ৩৩ হাজার ১৫১ জন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এসএসসি (ভোকেশনাল)-এ ১ লাখ ৩২ হাজার ১৯৮ জন এবং দাখিল (ভোকেশনাল)-এ ২ হাজার ৪৬২ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।
প্রযুক্তিগত তদারকি ও নিরাপত্তা: আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার রোববার বাসসকে জানান, এবারই প্রথম কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র পরিবহনকারীদের ডিজিটাল ট্র্যাকিং করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘গরমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে প্রতিটি কেন্দ্রের প্রবেশপথ সকাল সাড়ে ৮টায় খুলে দেওয়া হবে, যাতে কেন্দ্রের অভ্যন্তরে পরীক্ষার্থীরা অবস্থান নিতে পারে। এ ছাড়া কেন্দ্রে সুপেয় পানি, আইপিএস ও জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যানজট এড়াতে পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দেন।
সূচি অনুযায়ী, পরীক্ষা চলবে আগামী ২০ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হবে। আগামী ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা চলবে।
আগামী ১৮ জুনের মধ্যে হাতে লেখা নম্বরপত্র, ব্যবহারিক উত্তরপত্র, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র ও স্বাক্ষরলিপি বিভাগ অনুযায়ী রোল নম্বরের ক্রমানুসারে সাজিয়ে হাতে হাতে মাধ্যমিক পরীক্ষা শাখায় জমা দিতে হবে।
কেন্দ্রসচিবদের প্রতি ‘একগুচ্ছ’ নির্দেশনা: এদিকে পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে কেন্দ্রসচিবদের প্রতি একগুচ্ছ জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সেগুলো হল: নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের এবং অনিয়মিত/মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থীরা ২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশ নেবে।
পরীক্ষা শুরু হবে সকাল ১০টায়। পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট পূর্বে কক্ষে প্রবেশ করতে হবে। বিশেষ বিবেচনায় কোনো পরীক্ষার্থী দেরি করলে তার তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার ক্ষেত্রে দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ অফিসারের উপস্থিতিতে সেট কোড নিশ্চিত হয়ে প্যাকেট খুলতে হবে। নির্ধারিত সেট কোড ব্যতিরেকে অন্য সেটে পরীক্ষা নিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দ্রসচিব ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস কেন্দ্রে নিতে পারবেন না। কেন্দ্রসচিব কেবল ছবি তোলা যায় না এমন সাধারণ ফোন ব্যবহার করতে পারবেন।
৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা প্রতি বেঞ্চে ২ জন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে ১ জন পরীক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে পরিদর্শক নিয়োজিত থাকবেন।
কেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষার্থী বা অভিভাবকদের জটলা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে নির্দেশনায়। প্রয়োজনে হ্যান্ড মাইক ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে। পরীক্ষার শুরুতেই টয়লেটগুলো তল্লাশি করে কোনো নকলের সামগ্রী থাকলে তা অপসারণ করতে হবে।
প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র পরিবহনে অবশ্যই পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকতে হবে এবং ট্রাংক থেকে প্রশ্নপত্র বের করার সময় ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ড থেকে সরবরাহকৃত নকল প্রতিরোধমূলক পোস্টার কেন্দ্রের দৃশ্যমান স্থানে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের ভেতরে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারো অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাসসকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সম্পন্ন করতে চায়। কড়াকড়ি পদক্ষেপগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিবদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য।’
তিনি আরও জানান, আসন্ন কোনো পাবলিক পরীক্ষায় ‘নীরব বহিষ্কার’-এর সুযোগ থাকছে না। ১৯৬১ সালের নীতিমালার ২৯ নং অনুচ্ছেদ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের নির্ভয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সবার সাফল্য কামনা করেন শিক্ষামন্ত্রী।
সূত্রঃ বাসস



















