ইলিশের প্রজনন ও জাটকা সংরক্ষণসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের বেঁধে দেয়া ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দিবাগত মধ্যরাতে।
ফলে উপকূলীয় জেলা ভোলার জেলেরা মধ্যরাত থেকেই মাছ ধরতে নদীতে নামার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
দীর্ঘ ৬০ দিন মাছধরা বন্ধ থাকায় ভোলার অধিকাংশ জেলেই সরকারের সাহায্য পেয়েছে। তারা জানান, এবার দালালচক্রের হস্তক্ষেপ না থাকায় তারা সঠিকভাবে সরকারের সাহায্য পেতে কোনোপ্রকার বেগ পেতে হয়নি। আজ মধ্যরাত থেকে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা নদীতে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ আহরণের প্রত্যাশা করছেন। অধিক মাছ পাওয়ার আশায় এখানকার জেলেরা এখন উচ্ছ্বসিত। তারা এখন মাছ ধরার স্বপ্নে বিভোর। মেঘনার জলে ভোজানো যে জালগুলো ২মাস শুকনো ছিলো, সেই জালগুলো আবার ভিজানো হবে জলে। উত্তাল নদীর জলরাশিতে মিলবে হরেক রকমের মাছ। পরিবারের স্বপ্ন সফল হবে, এমন বুধভরা আশার জাল ছড়ানো হবে মেঘনার জলে।
সরেজমিনে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় ভোলা সদরের শিবপুর মাছঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা নদীতে নামতে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ জাল গোছাচ্ছেন, কেউ রান্নাবান্নার সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউবা নৌকা-ট্রলারের ইঞ্জিন সারাই করে ট্রায়াল দিচ্ছেন।
মেঘনা পাড়ের শিবপুর মাছঘাটের জেলে আব্দুর রশিদ, আবুল কালাম মাঝি ও রবিউল মাঝির সঙ্গে আলাপকালে তারা বাসস’কে বলেন, সরকারের ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা মেনে আমরা মাছ ধরতে ২ মাস নদীতে না নামলেও কিছু অসাধু লোক নদীতে মাছ মারতে নেমে যৌথবাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। জেলেরা বলেন, সকল জেলেদের সরকারি সহযোগিতার আওতায় আনা ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে পালন করা গেলে ইলিশের প্রজনন ও জাটকা সংরক্ষণসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদন বাড়ানোর কর্যক্রম শতভাগ সফল হবে।
ভোলার ইলিশা মাছঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, ২মাস বন্ধ থাকার পর সেখানকার আড়ৎগুলো সচল হচ্ছে। খুলছে সার্টার, চলছে ধোয়ামোছার কাজ। মাছের আড়ৎগুলোর বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা চায়ের দোকান, মুদি দোকান আর হোটেল রেস্তোরাঁগুলোও সরব হচ্ছে।
ভোলার আড়ৎমালিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বাদশা মিয়া বাসস’কে জানান, আজ দিনগত মধ্যরাত থেকে মাছধরা শুরু হলে আগামীকাল শুক্রবার ভোর থেকে আড়ৎগুলো জেগে উঠবে। শুরু হবে কেনাবেচার ধুম। এবার মৌসুমে প্রচুর ইলিশ’সহ অন্যান্য সবধরনের মাছ পাবার প্রত্যাশা এই মাছ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতার।
গত ১লা মার্চ থেকে আজ (৩০ এপ্রিল) পর্যন্ত ভোলার নদ-নদীতে সবধরনের মাছ ধরায় ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সরকার। এ ২মাস ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, বেতুয়া, বুড়া গৌরঙ্গা এবং ইলিশা নদীসহ ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিলো।
জেলায় এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মৎস্য বিভাগ জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করেছে। ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও তৎসংলগ্ন নদীগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এই নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নদীতে নামতে পারেনি জেলেরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বাসস’কে বলেন, জনসচেতনতা সভাগুলোতে কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধি, মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেরা অংশ নিয়েছিল।
তিনি বলেন, মেঘনা ও তেঁতুলিয়াসহ এখানকার নদীসমূহের ১৯০ কিলোমিটার এলাকার ২টি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ ছিলো। এতে করে জাটকা (ছোট ইলিশ) রক্ষা’সহ অনান্য সবধরনের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ছে বলে দাবি করেন তিনি। এজন্য মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে এ নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে স্থানীয় হাট-বাজার, জেলে পল্লী, মাছ ঘাট ও মৎস্য আড়ৎগুলোতে জেলেদের নিয়ে অনুষ্ঠিত জনসচেততা সভা অব্যহত ছিলো।
মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, জেলেদের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানান দিতে ব্যানার, পোষ্টার, লিফলেট ও মাইকিং এর মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এ সময়ে জেলেদের গ্রহণ করা ঋণের কিস্তিও ছিলো স্থগিত। ভোলার অভয়াশ্রমসহ দেশের মোট ৬টি অভয়াশ্রমে একইসময় থেকে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা ছিলো।
মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, শুধু জাটকা নয়, একই সময় একই সাথে অন্যান্য সকল মাছের পোনা অভয়াশ্রমে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। অভয়াশ্রম থেকে ২মাস মাছধরা থেকে বিরত থাকায় ইলিশ’সহ সব প্রকারের মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রত্যাশা তার।
ভোলার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বাসস’কে জানান, নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে জেলার নিবন্ধিত এক লাখ ৬৮ হাজার জেলের মধ্যে এক লাখ জেলে সহায়তা পেলেও ৬৮ হাজার জেলে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। তাই সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি এসব জেলেদের সহায়তার দাবি জানান মৎস্যজীবীরা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানান, ২মাস জাটকা ধরা বন্ধে ৯০ হাজার ২শত ১৩ জন জেলেকে মাসে ৪০ কেজি করে সরকারি চাল দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রথমবারের মতো সরকারের পক্ষ থেকে ৬ রকমের নিত্যপণ্য সামগ্রীও দেয়া হয়েছে জেলেদের। সবমিলিয়ে অন্যবারের চেয়ে এ সরকারের আমলে চালের পাশাপাশি আরো ৬ প্রকারের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পেয়ে খুবই আনন্দিত দ্বীপ উকূলীয় জনপদের জেলে সম্প্রদায়।
সূত্রঃ বাসস



















