
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। ৩৩টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কাগজে-কলমে ১৭ জন চিকিৎসক থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৩ জন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৭ চিকিৎসকের মধ্যে চারজন দীর্ঘদিন ধরে প্রেষণে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাদের বেতন-ভাতা ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রেষণে থাকা চিকিৎসকরা হলেন— ডা. রিপন কুমার সরকার, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি); ডা. নিরঞ্জন কুমার রায়, প্যাথলজিস্ট; ডা. মো. সাজেদুর রহমান চৌধুরী, মেডিকেল অফিসার এবং ডা. মৌসুমী বৈষ্ণব, সহকারী সার্জন।
বর্তমানে কর্মরত ১৩ চিকিৎসকের মধ্যে দুজন ডেন্টাল সার্জন এবং ১১ জন মেডিকেল অফিসার। তাদের একজনকে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের প্রভাব পড়েছে বিশেষজ্ঞ সেবাতেও। ইএনটি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রিপন কুমার সরকার প্রেষণে অন্যত্র থাকায় নিয়মিত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। পাশাপাশি শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে এসব বিভাগের চিকিৎসা নিতে রোগীদের নীলফামারী সদর হাসপাতাল কিংবা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, উপজেলায় তিন লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন। তিস্তা নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসাসেবা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে তাদের দূরের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রায়ই ১০০ ছাড়িয়ে যায়। এর পাশাপাশি ওয়ার্ডবয় ও আয়ার পদ শূন্য রয়েছে এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন মাত্র একজন। গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক ওয়াহাব আলী বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। কষ্ট করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। আমরা চাই, সরকারি এ হাসপাতালেই যেন সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোহলপাড়া গ্রামের গৃহবধূ লিলি বেগম বলেন, আমাদের মতো সাধারণ ও গরিব মানুষের রংপুরে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। আমরা চাই, সিজারিয়ান অপারেশনসহ ছোট-বড় সব ধরনের অস্ত্রোপচার যেন এ হাসপাতালেই হয়।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচপিও) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, হাসপাতালে ৩৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ১৭ জন। এর মধ্যে চারজন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বেতন নিলেও দীর্ঘদিন ধরে অন্যত্র কর্মরত। বর্তমানে হাসপাতালে ১৩ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। সীমিত জনবল নিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ডিমলায় বর্তমানে কোনো ডাক্তার সংকট নেই, শুধু কনসালট্যান্টের সমস্যা রয়েছে। ৪৮তম বিসিএসের পর আমরা মোটামুটি ডাক্তার পেয়েছি, এখন আমাদের ডাক্তার সংকট নেই।
অন্য মেডিকেলে দায়িত্ব পালন করে আরেক মেডিকেলের নামে বেতন তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন হওয়ার কথা নয়।