সাত মাস পর বাড়ি ফিরল রায়হান, এক পা হারানোর রহস্য এখনো অমীমাংসিত
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ১২ বছরের শিশু মুহাম্মদ রায়হান নিখোঁজের সাত মাস পর বাড়ি ফিরেছে। তবে একটি পা হারানো অবস্থায় ফিরে আসা এই শিশুর সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রায়হানের মাথা, চোখ ও পেটেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পর কীভাবে সে আহত হলো, কোথায় চিকিৎসা নিয়েছে, কারা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছে তার পরিবার।
রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড় নয়া পাড়ার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিনের ছেলে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর সে সৎ মায়ের সঙ্গে থাকত এবং স্থানীয় একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত।
পরিবারের ভাষ্য, বাড়িতে অবহেলা ও অনাদরের কারণে রায়হানের মন বসত না। এর আগে কয়েকবার সে বাড়ি থেকে পালিয়েও গিয়েছিল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর প্রথমে কক্সবাজার এবং পরে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। এরপর পরিবারের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ ছিল না।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৩ মে ‘হান্নান ভাই’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে রায়হানের পরিবারের সন্ধান চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ওই ভিডিওতে তাকে জীবিত ও স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়। তাকে আশ্রয় দেওয়া এক নারীও সেখানে কথা বলেন। রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারীর নাম সালমা।
পরবর্তী সময়ে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন ছিল রায়হান। ময়মনসিংহের তানভীর প্লাবন নামে এক যুবক দাবি করেন, তার এক আত্মীয় ওই হাসপাতালে রায়হানের পাশের সিটে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তারা গত ৮ জুলাই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে চলে যান। একই দিন রায়হানকেও ছাড়পত্র দেওয়া হয় বলে তার দাবি।
সম্প্রতি রায়হানের চিকিৎসাধীন অবস্থার একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। এতে দেখা যায়, তার একটি পা নেই। পাশাপাশি মাথার সামনের ডান পাশে, বাম চোখের নিচে এবং পেটের ডান পাশেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
চিকিৎসাধীন অবস্থার ভিডিওতে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, তার মা-বাবা নেই। ট্রেনের ছাদ থেকে কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে বলেও সে দাবি করে। তবে কীভাবে সে হাসপাতালে পৌঁছাল, কারা তাকে উদ্ধার করল বা তার পা কীভাবে কাটা পড়ল—সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাড়ি ফেরার পর রায়হান দাবি করে, ঢাকায় থাকার সময় তাকে শেখানো কথা বলতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার ভাষ্য, ওই কথা না বললে সালমা ও তার সহযোগীরা তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দিত।
রায়হানের বর্তমান বক্তব্য অনুযায়ী, সে প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার খেয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশে বাগানঘেরা একটি টিনশেড ঘরে ঘুমাতে যায়। পরদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পায়। তখন তার একটি পা ছিল না।
তবে ঘুমানোর পর থেকে হাসপাতালে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সময়ে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে রায়হানের বক্তব্যও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তার পা কোথায় এবং কীভাবে কাটা পড়ল, কে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল, অস্ত্রোপচার কোথায় হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
এদিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া রায়হানের বক্তব্য এবং বাড়ি ফেরার পর দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে তার বর্তমান বক্তব্যের সত্যতা কিংবা আগের বক্তব্য পরিবর্তনের কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার পা হারানোর প্রকৃত কারণও এখনো নিশ্চিত নয়।
রায়হানের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা নাজিম উদ্দিন সেখানে রয়েছেন। বিচ্ছেদের পর আলাদা থাকা রায়হানের মাও সন্তানের খোঁজে সেখানে এসেছেন। ছেলের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।
রায়হানের পরিবার জানিয়েছে, দারিদ্র্যের কারণে লোহাগাড়া থেকে ঢাকায় গিয়ে মামলা করা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, রায়হান ও তার পরিবার অত্যন্ত অসহায়। তার চিকিৎসা, শিক্ষা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে। মানবিকতার জায়গা থেকে রায়হানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।