
অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে দেশজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে মহানগর, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও প্রয়োজনীয় ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অপরাধ শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাদক, জুয়া, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিংসহ বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধে মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, আর্থিক লেনদেন ও সাইবার স্পেসের ব্যবহার বাড়ছে।
তিনি বলেন, অপরাধের ধরন পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় শুধু অবস্থান শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। টেলিফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য-প্রমাণ তদন্ত ও অভিযোগপত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত ইউনিটের পাশাপাশি বিভাগীয় সদর দপ্তরেও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়েও এসব ইউনিট গঠন করা হবে।
তিনি জানান, জেলা পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট থাকবে এবং উপজেলা বা থানা পর্যায়ে এক-দুজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সহযোগিতা নেবেন। এর মাধ্যমে দেশীয় অপরাধের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে।
মাদক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পৃথক ও বিশেষায়িত পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মাদকদ্রব্যের রাসায়নিক পরীক্ষা ও ফরেনসিক কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার ও শাস্তির ওপর নির্ভর না করে অপরাধের মূল কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেন অপরাধ হচ্ছে তা বিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে হবে। অপরাধের উৎসে সমাধান করতে পারলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, মাদক ও জুয়া অনেক অপরাধের অন্যতম উৎস। হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত অনেকের মাদকাসক্তি বা জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। মাদক বা জুয়ার অর্থ জোগাড় করতেও কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ায় আইনেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লেনদেন ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে জুয়ার বিস্তার ঘটলেও পুরোনো আইনে এসব অপরাধ মোকাবিলা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নতুন আইনে অনলাইন ও সাইবার স্পেসে জুয়া, সংঘবদ্ধভাবে জুয়া পরিচালনা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং ম্যাচ ফিক্সিংসহ বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্রাইম রিপোর্টিংকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধের ধরন জটিল ও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠায় ক্রাইম রিপোর্টারদের প্রযুক্তি, আইন এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে হবে।
সাইবার স্ক্যাম বা আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধে একাধিক দেশ বা বিদেশি অপরাধচক্র যুক্ত থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্রাইম রিপোর্টারদের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কেউ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা সরকার বিবেচনা করবে। প্রয়োজনে অন্য কোনো তহবিল বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) মাধ্যমেও সহায়তার চেষ্টা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সনদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।