
বিচ্ছেদ মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর শোক, একাকিত্ব, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা স্বাভাবিক হলেও এ সময় নিজেকে সামলে নেওয়া এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সচেতন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
হঠাৎ কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর কারণে ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, একাকীত্ব ও উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ব্রেকআপের পর প্রথম কয়েকটি দিন অনেকের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে ওঠে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে ভারতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘মার্গ মাইন্ডকেয়ার’-এর মনোবিজ্ঞানী শিরীন দারগানের পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, ব্রেকআপের পর প্রথম সপ্তাহে লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত প্রাক্তন সঙ্গীকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং নিজের মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা।
মনোবিজ্ঞানী শিরীন দারগান বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়া মানে প্রতিশোধমূলকভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় প্রমাণ করার চেষ্টা করা নয়, কিংবা প্রাক্তন সঙ্গী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী করছেন তা বারবার খোঁজ নেওয়াও নয়। পাশাপাশি ক্ষণিকের স্বস্তির জন্য নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া বা ক্ষতিকর কোনো অভ্যাসে জড়িয়ে যাওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত।
তার মতে, প্রথম সপ্তাহের মূল লক্ষ্য হলো নিজের অনুভূতিগুলো বুঝতে শেখা, মানসিকভাবে স্থির হওয়া এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসা।
ব্রেকআপের পর প্রথম সপ্তাহে নিজেকে সামলানোর জন্য কয়েকটি পরামর্শ—
১. নিজের মৌলিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন
মানসিক চাপের সময় ঘুম, খাবার ও শরীরের যত্নের মতো বিষয়গুলো অবহেলিত হতে পারে। তবে এগুলো ঠিক না থাকলে মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং হালকা শারীরিক কার্যক্রম বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত।
অনেক কিছু করার শক্তি না থাকলেও কিছুক্ষণ হাঁটা, গোসল করা বা স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মতো ছোট কাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
২. আবেগ চেপে রাখবেন না
ব্রেকআপের পর দুঃখ, রাগ, হতাশা বা একাকিত্ব অনুভব করা স্বাভাবিক। এসব আবেগ এড়িয়ে না গিয়ে স্বীকার করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট নিজের অনুভূতির জন্য সময় রাখা যেতে পারে। এ সময় ডায়েরিতে লেখা, কান্না করা বা নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবার মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে। তবে সারাদিন যেন এসব চিন্তাই নিয়ন্ত্রণ না করে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
৩. প্রাক্তনকে ঘিরে ডিজিটাল ট্রিগার এড়িয়ে চলুন
ব্রেকআপের পর প্রাক্তন সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, পুরোনো ছবি বা বার্তা ঘাঁটা এবং তার অনলাইন কার্যক্রম অনুসরণ করা মানসিক কষ্ট বাড়াতে পারে।
প্রয়োজনে কিছুদিনের জন্য আনফলো, মিউট বা গোপনীয়তা সেটিং ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি প্রতিহিংসা নয়, বরং নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করার একটি উপায়।
৪. কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
বিচ্ছেদের পর অনেকেই নিজেকে সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। তবে পুরোপুরি একা না থেকে অন্তত একজন বা দুজন বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।
সবসময় নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেই হবে এমন নয়। কাছের কারও সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে হাঁটা বা একবেলা খাবার খাওয়াও একাকিত্ব কমাতে সহায়তা করতে পারে।
৫. আবেগের বশে বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না
ব্রেকআপের পর মানসিক অস্থিরতার সময়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়া, প্রাক্তনকে বারবার বার্তা পাঠানো, অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ বা দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলা উচিত।
কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে সময় দেওয়া জরুরি। কারণ তীব্র আবেগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে।
ব্রেকআপের পর স্বাভাবিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া সবার জন্য এক নয়। কোনো দিন ভালো লাগতে পারে, আবার কোনো দিন মন খারাপ হতে পারে—এটি স্বাভাবিক। এর অর্থ এই নয় যে কেউ আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা চলতে থাকলে কিংবা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।