দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান, বোঝাপড়া ও নিয়মিত যোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দূরত্ব তৈরি হলে অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রীর জীবনে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে পরকীয়ার প্রকৃত চিত্র নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সীমিত হলেও, বিভিন্ন গবেষণা ও বিবাহবিচ্ছেদের তথ্য বিশ্লেষণে এটি বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২’–এর তথ্য অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ শতাংশ ব্যক্তি পরকীয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। একই জরিপে ২২ শতাংশ ব্যক্তি দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারাকে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে জানিয়েছেন।
দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, মানসিক দূরত্ব, অবহেলা, পারিবারিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ— এসব বিষয় সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের বিবাহিত প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণাতেও দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি, মানসিক সমর্থনের অভাব ও সম্পর্ক নিয়ে অসন্তোষকে পরকীয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে। পুরোনো বন্ধু বা পরিচিতদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপন, কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক কিংবা অনলাইন পরিচয়ের মাধ্যমে নতুন মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এককভাবে পরকীয়ার প্রধান কারণ বলা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্পর্কে আগে থেকেই দূরত্ব বা অসন্তোষ থাকলে অনলাইন যোগাযোগ অনেক সময় সেই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তি মানুষের সম্পর্ক, বিয়ে ও পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন পরিবর্তন করছে। তবে এটি সরাসরি কারণের চেয়ে নতুন ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
যোগাযোগ কমলে বাড়ে মানসিক দূরত্ব
একই ছাদের নিচে থেকেও অনেক দম্পতির মধ্যে ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়। কর্মজীবনের ব্যস্ততা, সময়ের অভাব, দীর্ঘদিন আলাদা থাকা কিংবা পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে একে অপরের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা কমে যেতে পারে। এর ফলে তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব।
অনেক সময় একজন মানুষ নিজের কথা বলার বা মানসিক সমর্থনের জায়গা খুঁজে না পেলে অন্য কারও কাছ থেকে সেই সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় পরকীয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, নির্যাতন, আসক্তি, বেকারত্ব, শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ এবং দাম্পত্য অসন্তোষের মতো কারণও উঠে এসেছে। তাই বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংকট হিসেবে দেখলে এর পেছনের অন্যান্য কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়।
মনোবিজ্ঞানী ও পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে তা দীর্ঘদিন গোপন না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি। একে অপরের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া, অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, বৈবাহিক অবিশ্বস্ততার পেছনে ব্যক্তির মানসিকতা, দাম্পত্য সম্পর্কের মান, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ— সবগুলো বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সমস্যা তৈরি হলে শুধু দোষারোপ না করে এর মূল কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পরিবারে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া বা পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও স্পষ্ট সীমারেখা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।