
পিত্তথলিতে পাথর (Gallstones) বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি সাধারণ সমস্যা। অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও কারও কারও তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস ও অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফলভাবে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
পিত্তথলি হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি ছোট থলির মতো অঙ্গ। এর প্রধান কাজ যকৃত থেকে উৎপাদিত পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় তা হজমে সহায়তার জন্য ক্ষুদ্রান্ত্রে পাঠানো।
পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এসব স্ফটিক বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, পিত্তথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া, অতিরিক্ত বিলিরুবিন এবং সংক্রমণ বা প্রদাহ পাথর তৈরির প্রধান কারণ।

পিত্তথলির পাথর সাধারণত তিন ধরনের—কোলেস্টেরল পাথর, পিগমেন্ট পাথর এবং মিশ্র পাথর। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই কোলেস্টেরল পাথর।
চিকিৎসকদের মতে, ‘৫এফ’ সূত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়—নারী (Female), ৪০ বছরের বেশি বয়স (Forty), অতিরিক্ত ওজন (Fat), সন্তান ধারণে সক্ষম নারী (Fertile) এবং পশ্চিমা দেশের ফর্সা ত্বকের মানুষ (Fair)। এছাড়া স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন কমানো, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাদ্য, কম আঁশযুক্ত খাবার, যকৃতের রোগ ও পারিবারিক ইতিহাসও ঝুঁকি বাড়ায়।
অনেকের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না এবং আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার সময় হঠাৎ ধরা পড়ে। তবে লক্ষণ দেখা দিলে সাধারণত পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, ব্যথা কাঁধ বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া, চর্বিযুক্ত খাবারের পর ব্যথা, বমি, বদহজম, পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।
জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল, দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ব্যথা বা বারবার বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

পিত্তথলির পাথর শনাক্তে সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ পরীক্ষা হলো আলট্রাসাউন্ড। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা, এমআরসিপি, সিটি স্ক্যান এবং ইআরসিপিও করা হয়।
যাদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অধিকাংশের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না; নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। তবে বারবার ব্যথা বা জটিলতা দেখা দিলে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয়, ফলে ব্যথা ও রক্তপাত কম হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সময়ে চিকিৎসা না নিলে পিত্তথলির তীব্র প্রদাহ, ফোঁড়া, পিত্তথলি ছিদ্র হওয়া, জন্ডিস, পিত্তনালির সংক্রমণ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং বিরল ক্ষেত্রে পিত্তথলির ক্যান্সারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করা, আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্য গ্রহণ, অতিরিক্ত চর্বি, ট্রান্স ফ্যাট ও ফাস্ট ফুড কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসর্গ না থাকলে সব রোগীর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। আবার ঘরোয়া বা বিকল্প চিকিৎসায় পাথর সম্পূর্ণ গলে যায়—এমন দাবিরও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পিত্তথলি অপসারণের পর অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
পেটের উপরের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি ব্যথা স্থায়ী হওয়া, জ্বর, বমি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিজে নিজে ওষুধ সেবনের পরিবর্তে আলট্রাসাউন্ডসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।