শাহজাদপুর উপজেলা প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সিআইডি জানায়, গত ১২ আগস্ট ২০২৬ দুপুর ১টার দিকে শাহজাদপুর থানাধীন জামিরতা বাজার এলাকা থেকে মো. রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সিরাজগঞ্জ জেলা ইউনিট। তদন্তে জানা যায়, ৩১ আগস্ট ২০২৩ সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করে আশরাফুলকে বাড়ি থেকে জামিরতা বাজারে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আশরাফুল আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরদিন তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আশরাফুলের বাবা শাহজাদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের পর আশরাফুলের স্বজনরা রফিকুলের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তার আচরণ ও বক্তব্যে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দীর্ঘ সময়েও কোনো খোঁজ না মেলায় আশরাফুলের মা মোছা. নাছিমা খাতুন ১৩ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে তিনজনকে আসামি করে বিজ্ঞ আদালতে পিটিশন মামলা নং-২৮৮/২০২৩ দায়ের করেন। আদালত মামলার তদন্তভার সিআইডি সিরাজগঞ্জের ওপর অর্পণ করেন। প্রথমদিকে মামলাটি ক্লু-লেস শিশু অপহরণ মামলা হিসেবে তদন্ত করা হলেও ভিকটিমের অবস্থান বা তার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরে মামলার তদন্তভার এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ আজমল হোসেনের ওপর অর্পিত হলে সিআইডি, সিরাজগঞ্জের বিশেষ পুলিশ সুপার জনাব মোনালিসা বেগম, পিপিএম-এর নির্দেশনায় তদন্তে নতুন গতি আসে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আরজি পুনঃবিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা এবং স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত পরিচালনা করেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি মো. রফিকুল ইসলামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আদালতের আদেশে মামলাটি পিটিশন মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় রুজু হলে তদন্ত আরও জোরদার হয়।
গ্রেপ্তারের পর নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল ইসলাম জানান, ভিকটিম আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তাদের সম্পর্কের মধ্যে তিনি জানতে পারেন, আশরাফুল আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন আশরাফুলকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে কৌশলে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে তাকে যমুনা নদীতে ফেলে দেন। তার দাবি, পরে নদীর স্রোতে মরদেহ ভেসে যায়।
সিআইডি জানায়, রফিকুল ইসলাম স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে বিজ্ঞ আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর আগে উল্লাপাড়া থানা এলাকায় মন্টু মিয়া নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে তাঁতের কাজে সহযোগিতা করার সময় তার বড় ছেলে শাহিনের সঙ্গে রফিকুলের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। পরে শাহিনের বিয়ের খবর জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পুরুষাঙ্গের অংশবিশেষ কেটে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ২৩ জুন ২০১৫ তারিখে শাহজাদপুর থানায় মামলা নং-২৫, ধারা-৩২৬/৩০৭ পেনাল কোডে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং বিচার শেষে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন।
সিআইডির দাবি, তদন্তে আশরাফুলকে অপহরণের আড়ালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হলেও এখনো তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রফিকুলের দেওয়া তথ্য এবং সম্ভাব্য অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে মরদেহের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানার রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার, আসামির দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।