আমের মৌসুম প্রায় শেষের পথে হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন আম বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্য করার মতো। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, মৌসুমের শেষদিকে বাজারে বেচাকেনায় গতি ফিরলেও পুরো মৌসুমে অধিকাংশ চাষি উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। ফলে মৌসুমের শেষদিকে কিছুটা দাম বাড়লেও অনেক চাষির মুখে রয়ে গেছে হতাশার ছাপ। যদিও ব্যাবসায়ীরা বরাবরের মতো এবারও ভাল ব্যাবসা করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে মৌসুমের শেষভাগে আশ্বিনা, বারি-৪, বারি-৮, গৌড়মতি, ব্যানানা ও কাটিমনসহ বিভিন্ন বারোমাসি জাতের আম’কে ঘিরে জেলার বৃহত্তম কানসাট বাজারে আমের বেচাকেনা চলছে বেশ জমজমাট। প্রতিদিন হাজার হাজার মণ আমের বেচাকেনা হচ্ছে এই আম বাজারে। শেষ সময়েও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
আজ মঙ্গলবার সকালে শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের আমচাষি হাসিবুল হাসান বাবুর সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমের মৌসুম প্রায় শেষ মূহুর্তে।
তিনি বলেন, আজ আমি আশ্বিনা আম ৩ হাজার ৮শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি। তবে উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এ দাম সন্তোষজনক নয় বলেও জানান তিনি।
দুর্লভপুর ইউনিয়নের আমচাষি মনিরুল ইসলাম আজ কানসাট বাজারে প্রতি মণ বারি-৪ আম ৭ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে বলেন, কয়েক বছর আগেও একই জাতের আমের দাম আরও বেশি পাওয়া যেত। তিনি আরও জানান, এখন আমের দাম কিছুটা বেশি তবে প্রথম দিকে প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়া যায়নি।
আমচাষি ও গণমাধ্যমকর্মী ফরহাদ আলী কাটিমন ম্যাঙ্গো নিয়ে বাজারে এসে প্রতি মণ ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে কিছুটা খুশি হলেও তিনি আম নিয়ে শোনালেন হতাশার কথা।
দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে আমের ব্যবসা করে আসছেন ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, মৌসুমের শেষদিকে আমের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এবছর মৌসুমজুড়ে আমের বাজার স্থিতিশীল ছিল না। তবে আমাদের মত ব্যবসায়ীরা চলতি বছর লাভজনক ব্যাবসা করেছি।
আমচাষী আবুল হাসনাত বলেন, জেলার অন্য চার উপজেলার সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি আম উৎপাদন হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। একসময় এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে ফজলি আমের চাষ হতো কিন্তু কয়েকবছর থেকে ফজলি আম হারভেস্টিং করার সময় ব্যানানা, কাটিমন, আম্রপালি ও বারি-৪সহ নতুন কয়েক জাতের আম বাজারে নামতে শুরু করে। ফলে এসময় ফজলির পরিবর্তে এসব আমের চাহিদা বেশি থাকে। তাই চাষিরা ফজলি আমের ন্যায্যমূল্য পায়না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর এলাকার আমচাষী সেন্টু মিয়া বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে আমের সঙ্গে যুক্ত আছি। প্রায় ১০ বছর আগে আম চাষ করে লাভবান হতাম, কিন্তু কয়েকবছর থেকে আমচাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ মিলছে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনা।
শিবগঞ্জ আম আড়ৎদার সমিতির সভাপতি আবু তালেব বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা আমের সঙ্গে জড়িত। উৎপাদন খরচ প্রতি বছর বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমের দাম বাড়ছেনা। কয়েকবছর থেকে চাষিরা নায্যমূল্য পাচ্ছেনা। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ আম শিল্প আজ হুমকির মুখে। কাজেই এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার জোর দাবি জানান তিনি।
এদিকে বর্তমানে জেলার কানসাট ও রহনপুরসহ অন্যান্য আমের বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি মন ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, বারি-৪ ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার, গৌড়মতি ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার, কাটিমন ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার এবং ব্যানানা ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মৌসুমের শেষভাগেও বাজারে আশ্বিনা, গৌড়মতি, ব্যানানা, বারি-৪সহ কয়েক জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রঃ বাসস