উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘বৃহত্তর দিনাজপুরের (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার পুরো প্রকল্প ব্যয় বাংলাদেশ সরকারের (জিওবি) নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে।
প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (কৃষি, পানিসম্পদ ও গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান বিভাগ) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বাসস’কে বলেন, গ্রামীণ সড়কগুলো উন্নত করে হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং অন্যান্য সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে গ্রামের সংযোগ জোরদার করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি ও অকৃষি পণ্য পরিবহন ও বিপণন সহজ হবে, যাতায়াতের সময় ও খরচ কমবে এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তি সহজ হবে। এছাড়া নির্মাণ ও পরিচালনা উভয় স্তরেই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রকল্পটিকে ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও জানান, এলজিইডি’র আওতাধীন গ্রামীণ রাস্তা, ইউনিয়নের রাস্তা এবং উপজেলার রাস্তাগুলো আরও উন্নত ও প্রশস্ত করা হবে। প্রকল্পের আওতায় এলজিইডি উপজেলার ২১.৭৫ কিলোমিটার রাস্তা, ইউনিয়নের ১৭১.৫৫ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৮৪২.৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা সব ঋতুতে চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। পাশাপাশি ৪১০ মিটার দীর্ঘ মোট ১৬টি সেতু নির্মাণ করা হবে।
সড়ক সুরক্ষা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে প্রকল্পটিতে ১০.৭ লাখ ঘনমিটারের বেশি মাটি কাটার কাজ, ৩ হাজার ৬৫০টি ট্রাফিক সাইন, ৭ হাজার ৩০০টি গাইড পোস্ট স্থাপন, ১৪ হাজার ৯০০ মিটার প্যালিসেডিং এবং ১২৯ হাজার ৬৫০ বর্গমিটার রোড মার্কিংয়ের কাজ রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আরেক কর্মকর্তা বাসস’কে জানান, এই অঞ্চলের একটি বড় জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধানেই। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্যই একনেক এই প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার সবকটি উপজেলা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত থাকবে।
কমিশন জানিয়েছে, উন্নত সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কৃষকদের এবং ব্যবসায়ীদের স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য আরও দক্ষতার সাথে পরিবহনে সহায়তা করবে। এর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচু ও সুগন্ধি চাল, ঠাকুরগাঁওয়ের আম এবং পঞ্চগড়ের চা। পাশাপাশি এটি অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থানের সূতিকাগার এই তিন জেলায় পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটাবে।
প্রকল্পটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ উন্নত করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দারিদ্র্য বিমোচন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অবদান রাখবে।
২০২৫ সালে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মির্জা ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিচালিত এক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রকল্পটি কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং এটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পটির জনসেবামূলক বৈশিষ্ট্যের কারণে সরাসরি কোনো আর্থিক মুনাফা বা রিটার্ন আশা না করা হলেও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এটি টেকসই ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) ৬৭৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (আইআরআর) ১৭.১২ শতাংশ এবং সুবিধা-ব্যয় অনুপাত (বিসিআর) ১.৩২:১।
পরিকল্পনা কমিশন উল্লেখ করেছে, প্রকল্পটি গ্রামীণ সব রাস্তা পর্যায়ক্রমে পাকা করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যোগাযোগ (লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি) নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এটি দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় লক্ষ্যগুলোকেও সমর্থন করে। এছাড়া, এই উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) বেশ কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই কৃষির প্রসার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ।
প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি বছরের গত ২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় তাদের পর্যবেক্ষণগুলো যুক্ত করার শর্তে প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশন পর্যবেক্ষণ করেছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর দিনাজপুরের গ্রামীণ পরিবহন অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। এতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সহজতর হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত হবে।