জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটে ‘সাংবাদিক নজরুল’কে নিয়ে শিগগিরই এক বছরের একটি ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হবে।
ইতোমধ্যে ইনস্টিটিউট থেকে ‘ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ’ শিরোনামে একটা প্রস্তাবনা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
‘নজরুল বর্ষ’কে সামনে রেখে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনিস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী বাসসকে এ কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আপসহীন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। ছিলেন নির্ভীক সম্পাদক। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে তিনি ১৯২০ সালের ১২ জুলাই কলকাতায় দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকায় নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ধুমকেতু, লাঙলসহ প্রায় ১০ থেকে ১২টি পত্রিকায় নজরুল সম্পাদক ছাড়াও নানা পদে কাজ করেছেন।’
তাই সাংবাদিক নজরুলকে নিয়ে আরো ব্যাপকভাবে জানতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সাংবাদিক নজরুল ইসলামকে নানামাত্রায় খুঁজে পেতে এই ডিপ্লোমা কোর্সটি সাজানো হয়েছে। কোর্সের উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে রয়েছে আধুনিক বাংলাদেশে ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার উত্তরাধিকার নজরুল, আদর্শ সাংবাদিকতা ও নৈতিকতায় নজরুল, নজরুলের সাংবাদিকতায় নারী মুক্তি, নজরুল বনাম ব্রিটিশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইত্যাদি।
এছাড়া চলতি বছরের আগস্ট মাসে কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু দিনটিকে সামনে রেখে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নজরুলের লেখায় তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান ও ভারত- এই চারটি দেশের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেসব দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শারীরিকভাবে যাননি, কিন্তু সেই দেশের সাহিত্য পড়ে প্রসঙ্গক্রমে তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে নানা বিষয় যুক্ত করেছেন। এ সম্মেলনে উল্লিখিত দেশের সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেসব দেশে নজরুল কতটা তাৎপর্যময় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে বলতে গেলে কাজী নজরুল ইসলামই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন উল্লেখ করে শিবলী বলেন, ‘তিনি হাফিজ, ফেরদৌসি, ওমর খৈয়ামের মতো কালজয়ী কবিদের কাব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আমরা যে আজকের পারস্য সাহিত্য পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়েছি তা মূলত নজরুলের চোখ দিয়েই সে সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আবার, ইরান বা তুরস্কের কথাও যদি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করি তাহলেও একই কথা চলে আসে। ইরানের রাষ্ট্রদূতের সাথে কয়েকবার মিটিং করে তাঁর কাছে জাতীয় কবির সাহিত্য অনুবাদ করার অনুরোধ জানিয়েছি। বলেছি, ‘তোমরা নজরুলকে ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করো। কারণ নজরুলের লেখনীর মাধ্যমে ইরানের সাহিত্য পড়তে ও জানতে পেরেছি। তিনি এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন।’
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৩ মে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বছরব্যাপী নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেন। এরপর ২১ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত এই এক বছরকে ‘ নজরুল বর্ষ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা চলতি বছরের ২৫ মে থেকে কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়।
নজরুল বর্ষ নিয়ে ইনস্টিটিউটের নানা পরিকল্পনা রয়েছে- এ কথা উল্লেখ করে নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, বাংলাদেশের ২৫ টি জেলায় কাজী নজরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। এসব স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহের কথা অনেকেই জানেন না। তাই ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে জাতীয় কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোকে শনাক্ত করে কবির কবিতা ও বিশেষ রচনার কিছু অংশ ফলক আকারে স্থাপন করা হবে। যাতে সেইসব স্থান পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। পাশাপাশি নজরুল প্রেমীরাও এসব স্থানকে তাদের পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন।
জাতীয় কবিকে স্মরণীয় রাখতে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় দেশের ৬৪ জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে ‘নজরুল উৎসব’ করা হবে। এদিকে দেশের ১২ জেলায় ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে ‘নজরুল উৎসব’ উদযাপন করা হবে। সম্প্রতি কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বান্দরবান ও কক্সবাজার- এ চার জেলায় এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিবলী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম অবহেলিত ছিলেন। ২০২৪ এ যে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ ও নতুন সরকার আমরা পেয়েছি, সেখানে আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়-আমরা যে লড়াই করা জাতি, দ্রোহে-বিপ্লবে, সংকটে আমরা যে সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে যাই, এটাই বাঙালির সংস্কৃতি। এই লড়াইয়ের সংস্কৃতিকে ধারণ করা সম্ভবপর হয়েছে যে কয়জন ব্যক্তিত্বের কারণে, তার মধ্যে অন্যতম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে ২০২৪ সালে সরকারিভাবে গেজেট নথিভুক্ত করে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটি ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছিল এ ইনস্টিটিউট।
অন্যদিকে, জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্মের বৈশ্বিক প্রচারের লক্ষ্যে দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর পর চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর রচনার ইংরেজি অনুবাদের একটি নতুন সংকলন ‘কুইন্টেসেন্স অব নজরুল’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। অনলাইনে এটি ই-বুক হিসেবে পাওয়া যাবে। আমরা চাচ্ছি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বইটি অনুবাদ করা হোক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে এ ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি বছর অন্তত বিদেশী একটি ভাষায় অনুবাদ করার।
শিবলী বলেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। তাঁর বৈশ্বিক বোধ ও ভাবনা ছিল প্রখর। তাঁর রচিত সৃষ্টিকর্মের দিকে তাকালে সহজেই তা অনুমেয়। নজরুল তাঁর রচনায় লিখেছিলেন, “আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের, এই সমাজের নই, আমি সকল দেশের,সকল মানুষের”। তিনি শুধু জাতীয়তাবাদী গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। আন্তর্জাতিক চেতনাতেও উদ্দীপ্ত ছিলেন। তিনি লিখেছেন,“আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির”-এ তেজোদীপ্ত কথা যিনি লিখেন তাতে স্পষ্টত বোঝা যায়, নজরুল বিশ্বকে ছাড়িয়ে গ্রহ-গ্রহান্তরে পৌঁছে যেতে চেয়েছেন। সময় এসেছে, তাই আমরা কাজী নজরুল ইসলামের অধরা এই চিন্তার স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করতে চাই।
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণার এ উদ্যোগ সময়োপযোগী। সৈনিক নজরুলকে নিয়ে বলতে চাই -শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল লক্ষ্য করা যায়। আর তা হল এই দুজনের দেশপ্রেম। তাঁরা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের শুরুতে ‘উই রিভোল্ট’ বলে প্রথমবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর এই ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাঙালি সেনারা সাহসের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। অপরদিকে, কাজী নজরুল ইসলাম বিট্রিশদের বিরুদ্ধে ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে প্রথমবারের মতো এ মহাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। আর অন্যজন দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন ‘উই রিভোল্ট’- আল্টিমেটলি একই বিষয়।’
তিনি বলেন, দেশের জাতীয় এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক। পদক প্রবর্তনের পর সর্বপ্রথম কাজী নজরুল ইসলাম এই সম্মাননা অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান একুশে পদক প্রবর্তন করেন। সর্বপ্রথম সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে আরো ৯ জন একুশে পদকে ভূষিত হন।
তিনি বলেন, ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশে ‘সর্বোচ্চ র্যাংক’-দিয়ে সম্মানিত করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হবে। কেননা, আমাদের মনে হয়, এভাবে সম্মানিত করলে কাজী নজরুল ইসলাম আরো বেশি আমাদের হয়ে উঠবেন।
শিবলী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটে প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে। নজরুল বিষয়ক নিজস্ব প্রকাশনাও রয়েছে। ইনস্টিটিউটে সবার জন্য উন্মুক্ত একটা লাইব্রেরি রয়েছে। এ লাইব্রেরিতে বসেও গবেষণা করার সুযোগও রয়েছে।