ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হওয়া শীর্ষ সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি তুলে ধরবে।
তুরস্কের বিশাল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন ঠিক এক বছর আগে ট্রাম্পের চাপের মুখে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো নিরাপত্তা-সম্পর্কিত ব্যয় মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছিল।
আঙ্কারা থেকে এএফপি জানায়, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো সামরিক বাজেট বাড়িয়ে এবং রাশিয়ার হুমকির মুখে নিজেদের মহাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে গ্রহণের মাধ্যমে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে।
শীর্ষ সম্মেলনের আগের দিন আঙ্কারায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মাত্র এক বছরের মধ্যেই আমরা যুগান্তকারী অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি।’
ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে ন্যাটো একাধিক চমকপ্রদ পরিসংখ্যান ও উদ্যোগ তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘এখনই নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের সময়।’
মূল শীর্ষ সম্মেলনের আগে মঙ্গলবার আয়োজিত প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্রচুক্তি ঘোষণা করা হবে, যাতে ট্রাম্পকে দেখানো যায় যে সদস্য দেশগুলো শুধু প্রতিশ্রুতিই দেয়নি, বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছে।
এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কানাডা সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, দেশটির নতুন সাবমেরিন বহর নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে জার্মানির থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস। বহু বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পকে ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে অটোয়া।
তবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প শীর্ষ সম্মেলনের আগে থেকেই মিত্রদের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। তার অভিযোগ, তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট দ্রুত নিচ্ছে না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘সম্পর্ক যদি পারস্পরিক না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একতরফাভাবে এ পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া হাস্যকর। তারা আমাদের পাশে ছিল না!’
‘বাস্তব পরিবর্তন’
ইউরোপীয় নেতারা অন্তত এমন কোনো প্রকাশ্য বিরোধ এড়াতে চান, যা ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ট্রাম্প এর আগেও একাধিকবার মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কূটনীতিকদের আশা, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক এবং ন্যাটো মহাসচিব রুটের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ট্রাম্পকে সংযত রাখতে সহায়ক হবে।
তবে ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। ফলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইরান প্রশ্নে নিজেদের সদিচ্ছা প্রদর্শনের লক্ষ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য একটি নৌ-মিশনের পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশ তাদের যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলের কাছাকাছি মোতায়েন করেছে, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত অভিযান শুরু করা যায়।
তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থির। ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নাজুক সমঝোতার অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার পরই নৌবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
যদিও ইউরোপীয় নেতারা আশা করছেন, ট্রাম্প সম্মেলনে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেবেন, তবু তারা এখন এ বাস্তবতা মেনে নিতে শুরু করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা কমিয়ে আনছে।
ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে, ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার নেতৃত্ব এখন মিত্র দেশগুলোকেই নিতে হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর কমান্ডারদের জন্য বরাদ্দ সামরিক সক্ষমতার পরিমাণও কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে নিজেদের অধিক দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়, অন্যদিকে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তিকে যতটা সম্ভব ন্যাটোর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখারও চেষ্টা করছে।
রুটে বলেন, ‘এসবই মানসিকতার প্রকৃত পরিবর্তনের প্রমাণ। এটি ন্যাটো ৩.০—একটি শক্তিশালী ন্যাটোর মধ্যে আরও শক্তিশালী ইউরোপ।’
‘সাহসী সিদ্ধান্ত’
নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলো এখন প্রায় পুরোপুরিভাবে ইউক্রেনকে সহায়তার দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মঙ্গলবার ন্যাটো নেতাদের নৈশভোজে অংশ নেবেন। সেখানে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে তিনি ২০২৬ ও ২০২৭ উভয় বছরই ইউক্রেনকে বছরে অন্তত ৭০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮ হাজার কোটি ডলার) সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পাবেন।
আঙ্কারা সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেরও কথা রয়েছে জেলেনস্কির।
সম্প্রতি রাশিয়ার ভয়াবহ হামলায় প্রায় ৩০ জন নিহত হওয়ার পর ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ন্যাটোকে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সম্মেলনের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের টেলিফোনে কথা হয়েছে। জেলেনস্কি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনছে এবং মস্কোকে অর্থবহ শান্তি আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন।