ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে প্রতিদিন অসংখ্য উদ্যোগের জন্ম হয়, আবার অনেক স্বপ্ন হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু গল্প আলাদা—যেখানে প্রতিকূলতা, অবহেলা আর মানসিক চাপকে পেছনে ফেলে এক নারী নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন। তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম মারুফা আক্তার স্বর্ণা, যিনি মাত্র ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন ব্যবসা। আর আজ যার মাসিক ব্যয়ই ছাড়িয়ে গেছে ১৪ লাখ টাকা।
স্বর্ণা তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। সময়টা ২০১৪ সাল, তখনই ব্যবসা শুরু করেন তিনি। রাজধানীর বারিধারা মহিলা সমিতি থেকে নেওয়া মাত্র ২০ হাজার টাকার ঋণই ছিল তার মূল পুঁজি।
ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজে কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও, নিজের পরিচয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই তাকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নিয়ে আসে। তার ভাষায়, ‘আমি চাইতাম, আমার নিজের একটা পরিচয় থাকুক— যেটা আমার পরিশ্রমের ফসল।’
তবে উদ্যোক্তা হওয়ার এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। মা-বাবা চাইতেন তিনি বিসিএস ক্যাডার, ব্যাংকার কিংবা চিকিৎসক হন। কিন্তু মারুফার একগুঁয়েমি ছিল— তিনি ব্যবসা করবেন।
এই সিদ্ধান্তের কারণে পরিবারে শুরু হয় এক ধরনের অঘোষিত দ্বন্দ্ব। তাকে একঘরে করে রাখা হয়, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তার সিদ্ধান্তকে ছোট করে দেখা হয়। এমনকি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেও তাকে একই ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়।
এই চাপ তাকে মানসিকভাবে কুরে কুরে খায়। তিনি ডিপ্রেশনে চলে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জেদই তাকে টিকিয়ে রাখে। সেই জেদই আজ তার সাফল্যের মূল শক্তি।
একটি শাড়ি দিয়ে শুরু হয়েছিল স্বর্ণার উদ্যোগ—‘কালার ক্রেজ’। নিজের ডিজাইন করা শাড়িই ছিল তার প্রথম পণ্য। তার ডিজাইন করা শাড়ির বাহারি নাম রয়েছে । সঞ্চারী, রোকেয়া, কাদম্বিনী, জ্যোতির্ময়ী, ইন্দুবালা, তিয়ানা, ইরাবতী— এই নামগুলো শুধু শাড়ির নাম নয়, বরং প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে একটি করে গল্প।
কখনো মায়ের নাম, কখনো কোনো প্রিয় মানুষের স্মৃতি, আবার কখনো দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ক্রেতার প্রতি শ্রদ্ধা।
বর্তমানে ‘কালার ক্রেজ’ একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড। রাজধানীর উত্তরা, ধানমন্ডি ও বেইলি রোডে রয়েছে তিনটি শোরুম। পাশাপাশি রয়েছে স্টুডিও ও ডিসপ্লে জোন। মিরপুর-১২ নম্বরে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ কারখানা।
বর্তমানে স্বর্ণার ব্যবসার পরিসর এতটাই বড় যে কারখানা ও শোরুমের ভাড়া এবং প্রায় ৫০ জন কর্মীর বেতন বাবদ মাসে খরচ হয় সাড়ে ১৪ লাখ টাকার বেশি।
তবে এত ব্যয়ের পরও তিনি সন্তুষ্ট। কারণ লাভের প্রতিটি অংশ তিনি আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে নিজের প্রতিষ্ঠানকে বড় করে তোলাই তার মূল লক্ষ্য।
স্বর্ণা জানান, নিজের বিয়েতেও তিনি নিজেই দেড় লাখ টাকা খরচ করেছেন। ঢাকায় নিজের টাকায় একটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছেন। বর্তমানে ব্যাংকের কাছে তার কোনো ঋণ নেই— যা একজন উদ্যোক্তার জন্য বড় অর্জন।
যে পরিবার একসময় তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি, আজ তারাই তার শক্তি। তার বাবা এখন কারখানা দেখাশোনা করেন। স্বামী যোবায়ের বিন হাবিব শুরু থেকেই তার পাশে রয়েছে। বর্তমানে তিনি ব্যবসার আর্থিক লেনদেন ও ফটোগ্রাফির কাজ সামলান। এই পারিবারিক সমর্থনই এখন মারুফার জন্য বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারুফার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার মাতৃত্ব। তাদের একমাত্র ছেলে আলিশের যোবায়ের শুদ্ধ— যার বয়স এখন তিন বছরের কিছু বেশি। গর্ভাবস্থার সময়ও তিনি ব্যবসার কাজ চালিয়ে গেছেন। কাপড় সংগ্রহের জন্য নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। এমনকি সন্তান জন্ম দেওয়ার একদিন আগেও তিনি লাইভে এসে পণ্য বিক্রি করেছেন।
সন্তানের জন্মের মাত্র ২৯ দিন পর থেকেই তিনি আবার কাজে ফিরে যান। ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই ঘুরেছেন বিভিন্ন হাট-বাজারে। এই অভিজ্ঞতা ছিল কঠিন, কিন্তু তিনি কখনো সন্তানকে অবহেলা করেননি। তার মতে, ‘ক্যারিয়ার আর সন্তান— দুটোকেই একসঙ্গে সামলানো সম্ভব, যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে।’
ব্যবসার পাশাপাশি নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন মারুফা। তিনি নিয়মিত কাউন্সেলিং নেন। তিনি মনে করেন, কঠিন সময় আসার আগেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা জরুরি। তার এই সচেতনতা তাকে কঠিন সময় পার হতে সাহায্য করেছে।
২০২৫ সালে তার ব্যবসা বড় একটি সংকটের সম্মুখীন। একজন কর্মী ২২ লাখ টাকার হিসাবের গরমিল করেন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
মারুফার ব্যবসার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো— দেশীয় পণ্যের প্রতি তার অঙ্গীকার। তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশ পণ্যই দেশীয়। তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে কিছু কাপড় বিদেশ থেকেও আনেন।
মারুফা আক্তার স্বর্ণা বিশ্বাস করেন, দেশীয় পণ্য দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব— যদি নকশা ও মান ঠিক রাখা যায়।
‘কালার ক্রেজ’ শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান না মারুফা। তার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা। তিনি চান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে তার শোরুম থাকুক। বিদেশি ক্রেতাদের জন্য আলাদা ডিজাইনের পোশাক তৈরি করতে চান। এর জন্য তিনি নিজেকে আরও প্রস্তুত করছেন— বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন ও মার্কেটিং কৌশল উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি একটি বড় শিক্ষা পেয়েছেন— চাপ দিয়ে কাউকে সফল করা যায় না।
তাই নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি চান, তার ছেলে নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিজের ভবিষ্যৎ গড়ুক।
স্কুলে প্রথম হতে হবে— এমন কোনো চাপ তিনি সন্তানের ওপর দেবেন না। তার মতে, ‘সুখী মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।’
মারুফা আক্তার স্বর্ণার গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়— এটি একটি মানসিক লড়াইয়ের গল্প, একটি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভাঙার গল্প। মাত্র ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো— এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য মারুফার গল্প একটি বড় অনুপ্রেরণা। তিনি দেখিয়েছেন, পরিবার, সমাজ কিংবা পরিস্থিতি— কোনো বাধাই শেষ কথা নয়। যদি স্বপ্ন থাকে, সাহস থাকে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে— তাহলে ২০ হাজার টাকার ছোট উদ্যোগও একদিন কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারে।
মারুফার ভাষায়, ‘স্বপ্ন দেখতে হবে, আর সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হবে। তাহলেই সফলতা আসবেই।’
সূত্রঃ বাসস