মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ আলোচনার প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা শনিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইরান বৃহস্পতিবার রাতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে নতুন খসড়া প্রস্তাব জমা দেয়। তবে এতে কী রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা ৮ এপ্রিল থেকে স্থগিত রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে এক দফা শান্তি আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মুহূর্তে তারা যা প্রস্তাব দিচ্ছে, তাতে আমি সন্তুষ্ট নই।’ তিনি ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে ‘তীব্র মতবিরোধের’ অভিযোগও তোলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কি গিয়ে তাদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়ে চিরতরে শেষ করে দেব—নাকি একটি চুক্তির চেষ্টা করব?’ তবে ‘মানবিক কারণে’ তিনি প্রথম পথটি নিতে চান না বলেও উল্লেখ করেন।
শনিবার সকালে ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাফর আসাদি ফার্স নিউজ এজেন্সিকে বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রমাণ হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিশ্রুতি বা চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।’
‘জলদস্যুর মতো’
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই শুক্রবার বলেন, তার দেশ ‘কখনো আলোচনায় অনাগ্রহ দেখায়নি’, তবে শান্তিচুক্তির নামে কোনো ‘চাপিয়ে দেওয়া শর্ত’ মেনে নেবে না।
হোয়াইট হাউস সর্বশেষ ইরানি প্রস্তাবের বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ আগের একটি প্রস্তাবে সংশোধনী এনে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন শর্তে ইরানকে বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে না নেওয়া এবং আলোচনার সময় সেখানে কার্যক্রম পুনরায় শুরু না করার দাবি জানানো হয়েছে।
ইরানের নতুন প্রস্তাবের খবরে তেলের দাম সাময়িকভাবে প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে যায়। তবে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় দাম এখনও প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালেিত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও সার সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে।
শুক্রবার এক সমাবেশে ট্রাম্প অবরোধ চলাকালে একটি তেলবাহী জাহাজে হেলিকপ্টার অভিযান চালানোর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আমরা যেন জলদস্যুর মতো।’
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও লেবাননে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে পৃথক যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল সেখানে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে হাব্বুশ শহরের বাসিন্দারাও রয়েছেন, যেখানে হামলার আগে ইসরাইলি বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা জারি করেছিল।
এদিকে শুক্রবার গভীর রাতে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর জন্য বড় অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে কাতারের জন্য ৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি এবং ইসরাইলের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে।
‘সমাপ্ত’
ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদনের সময়সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না- তা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, যুদ্ধবিরতির কারণে ৬০ দিনের সময়সীমা স্থগিত রয়েছে। তবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুস্পষ্ট সামরিক সাফল্যের অভাব এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেও রয়েছেন।
কংগ্রেস নেতাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, ‘২০২৬ সালের ৭ এপ্রিলের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ও ইরানের মধ্যে আর কোনো গোলাগুলি হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শত্রুতা শেষ হয়েছে।’
ইরানে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গভীর হচ্ছে।
ওয়াশিংটন তিনটি ইরানি মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য ইরান যে ‘টোল’ দাবি করছে, তা পরিশোধ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের অবরোধে ইরানের ৬ বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগেই উচ্চ থাকা ইরানের মূল্যস্ফীতি এখন ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
তেহরানের ৪০ বছর বয়সী বাসিন্দা আমির এএফপিকে বলেন, ‘সবাই কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘এখনও পুরো অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যায়নি। কারণ মানুষের কিছু সঞ্চয় ছিল- স্বর্ণ ও ডলার ছিল খারাপ সময়ের জন্য। সেগুলো শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি বদলে যাবে।’
এদিকে ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত দুই ব্যক্তিকে শনিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ ধরনের একাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যে এটিও একটি।
নিহতদের একজন গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলকে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
সূত্রঃ বাসস