ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার কাছে রাতে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৮৪ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে দুর্ঘটনাস্থলে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা কেএআই’র মুখপাত্র আনা পুরবা ভোরে স্থানীয় টেলিভিশনকে জানান, দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত এবং ৮৪ জন আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত অবস্থায় আটকে থাকা আরও দুইজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
একজন বেঁচে যাওয়া যাত্রী জানান, একটি দূরপাল্লার ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা কমিউটার ট্রেনকে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অনেক যাত্রী ভেতরে আটকে পড়েন।
২৯ বছর বয়সী আহত যাত্রী সাউসান সারিফাহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় এএফপি’কে বলেন, ‘ভেবেছিলাম আমি মারা যাব।’
তিনি বর্তমানে আরএসইউডি বেকাসি হাসপাতালে একটি হাত ভাঙা এবং উরুতে গভীর ক্ষত নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তিনি জানান, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে জাকার্তা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের বেকাসি তিমুর স্টেশনে তার ট্রেনটি থামে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু এক মুহূর্তে ঘটে যায়। সবাই নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ খুব জোরে লোকোমোটিভের শব্দ শুনতে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বের হওয়ার সময়ই পাইনি। সবাই ট্রেনের ভেতরে একে অপরের ওপর চাপা পড়ে। আমার নিচে থাকা ব্যক্তিটির কী অবস্থা, আমি জানি না।’
তিনি বলেন, মানুষের এ জটলার মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ভয় ছিল। নিচে চাপা পড়াদের কেউ হয়তো বাঁচেনি বলেও তিনি আশঙ্কা করেন।
তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি ওপরে ছিলাম। তাই আমাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’
রেল অপারেটর কেএআই’র মুখপাত্র ফ্রানোটো উইবোও বলেন, একটি লেভেল ক্রসিংয়ে একটি ট্যাক্সি কমিউটার ট্রেনকে ধাক্কা দিলে সেটি লাইনে থেমে যায়। এরপর দূরপাল্লার ট্রেনটি এসে ধাক্কা দেয়।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকর্মীরা অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য চিৎকার করছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে স্ট্রেচারে করে লোকজনকে বের করে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল। শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে হতবাক দেখা যায়।
ডেপুটি হাউস স্পিকার সুফমি দাসকো আহমেদ বলেন, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকর্মীরা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ট্রেনের বগি থেকে আরও অনেককে বের করার কাজ করছেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, উদ্ধার প্রক্রিয়া এখনও চলছে। তাই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ফ্রানোটো কম্পাস টিভিকে বলেন, সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী, জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা এবং রেড ক্রস উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে।
জাকার্তা পুলিশের প্রধান আসেপ এডি সুহেরি জানান, দূরপাল্লার ট্রেনটি কমিউটার ট্রেনের শেষ বগিতে ধাক্কা দেয়। ওই বগিটি শুধু নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
তিনি বলেন, নিহতদের সবাই ওই কমিউটার ট্রেনের যাত্রী। অন্য ট্রেনের প্রায় ২৪০ জন যাত্রীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাকার্তা অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ সংঘর্ষে ট্রেনের বেশ কয়েকটি বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের তীব্রতায় কয়েকজন যাত্রী বগির ভেতরে আটকা পড়েছেন।
সংস্থাটি জানায়, উদ্ধারকারীরা বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিধ্বস্ত ট্রেনের ভেতরে আটকে পড়াদের বের করে আনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
৩৯ বছর বয়সী ইভা চেয়ারিস্তা এএফপিকে জানান, দুর্ঘটনায় ২৭ বছর বয়সী ফিরা নামে তার ননদ আহত হয়েছেন শুনে তিনি দ্রুত আরএসইউডি হাসপাতালে ছুটে যান।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটিতে সর্বশেষ বড় ট্রেন দুর্ঘটনায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিম জাভা প্রদেশে চারজন ক্রু সদস্য নিহত এবং প্রায় দুই ডজন মানুষ আহত হন।
ইন্দোনেশিয়ায় পরিবহন দুর্ঘটনা নতুন নয়। বিশাল এ দ্বীপদেশে পুরোনো যানবাহন ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাস, ট্রেন এমনকি বিমান দুর্ঘটনাও প্রায়ই ঘটে।
২০১৫ সালে জাকার্তায় একটি লেভেল ক্রসিংয়ে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে মিনিবাসের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হয়।
সূত্রঃ বাসস