টানা পাঁচ আমন মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলেও চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শতভাগের বেশি ক্রয় করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধান, সিদ্ধ ও আতপ চাল মিলিয়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৩ টন। মৌসুম শেষে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৯১ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। আগের পাঁচ মৌসুমে যেখানে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, সেখানে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়াকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন মৌসুমে উৎপাদিত প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৪ টাকা, সেদ্ধ চাল ৫০ ও আতপ চালের দাম নির্ধারণ হয়েছে ৪৯ টাকা। যদিও গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর ধানে ১ টাকা এবং আতপ ও সেদ্ধ চালে কেজিপ্রতি ৩ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে সরকার। আগের বছরের তুলনায় ধান ও চালে দাম বাড়ানোয় কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমন ধান, সেদ্ধ ও আতপ চাল ক্রয়ের সময়সীমা নির্ধারণ করে সরকার। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ৯টি জেলায় প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩১ টন। যদিও পরবর্তী সময়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৩ টন ধান, সেদ্ধ ও আতপ চাল কেনার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে ৬ হাজার ৬৩৭ টন ধানের বিপরীতে কেনা হয়েছে ২১ হাজার ৫১১ টন; ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮৭ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে কেনা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৪৩ টন এবং ৩৫ হাজার ৫২৯ টন আতপ চালের বিপরীতে কেনা হয়েছে ৩৫ হাজার ৩৩৭ টন। যেখানে প্রতি বছর মৌসুম শেষে ধান বা চাল কিনতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে এ মৌসুমে ধান-চাল কেনার হার নিয়ে সন্তুষ্ট খাদ্য অধিদপ্তর।
পরিসংখ্যান বলছে, টানা পাঁচ মৌসুমের ব্যর্থতার পর চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত প্রায় ১০ শতাংশ ক্রয় করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার ১৭০ টন। এর বিপরীতে কেনা হয় ২ হাজার ৯৪১ টন। সেদ্ধ চাল ৫৮ হাজার ৪১০ টনের বিপরীতে কেনা হয় ৩৯ হাজার ১৭১ টন এবং আতপ চাল ২৬ হাজার ৯৭৫ টনের বিপরীতে কেনা হয় ২০ হাজার ৫৭১ টন। অর্থাৎ ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৫৫ টনের বিপরীতে ৬৩ হাজার টন ধান-চাল ক্রয় করে খাদ্য অধিদপ্তর। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৭৩৫ টন। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯০ টন কেনা হয়। ৪৫ হাজার ৩৭৮ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৪৩ হাজার ৬০৬ ও ৫৭ হাজার ২৮ টন আতপ চালের বিপরীতে কেনা হয় ২৩ হাজার ৮৩৩ টন।
এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৭২১ টন ধানের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৯ টন, ৪৩ হাজার ২৮৯ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৩১ হাজার ৯৬৬ টন ক্রয় করা হয়। এ বছর আতপ চাল কেনা বন্ধ ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৬১৩ টন ধানের মধ্যে ১২ হাজার ৭৪৯ টন ও ৫৮ হাজার ১৮৪ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৫৬ হাজার ৬৮৫ টন কেনা হয়। এ বছরও আতপ চাল কেনা বন্ধ ছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৩৫৪ টন ধানের মধ্যে ৯৬৪ টন, ৩৭ হাজার ৮৫০ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ২ হাজার ১৯৬ টন এবং ১০ হাজার ৩৮৮ টন আতপ চালের বিপরীতে কেনা হয় মাত্র ১ হাজার ১৮১ টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধান-চালের মান রংপুর বা ময়মনসিংহের মতো উন্নত নয়। তবে কৃষি প্রযুক্তিতে আধুনিক ও নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন হওয়ায় এ অঞ্চলের উৎপাদনের পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। যে কারণে জমির মান, আবহাওয়া, লবণাক্ততা ইত্যাদি বিবেচনা করে মানসম্মত ফসল উৎপাদনে পদক্ষেপ নিতে হবে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি. এম. ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, চলতি মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান-চাল সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দাম বাজার দরের কাছাকাছি থাকায় কৃষকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের সহকারী উপপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত আমন মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছিল। তবে চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন অনেক ভালো। যার কারণে সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার বেশি ধান-চাল কেনা সম্ভব হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই জেলা পর্যায়ে নির্ধারণ করে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণে করণীয় সম্পর্কে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যাদের মাধ্যমে ধান-চাল ক্রয় করা হয়েছে, তারাও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বেশ খুশি হয়েছেন। এ ধারা যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য আমরা কাজ করব।’
সূত্রঃ বাসস