ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যয়বহুল এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তেহরান তাকে সহজ কোনো কূটনৈতিক সাফল্য এনে দিতে রাজি নাও হতে পারে।
ট্রাম্প এখনো ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছেন। অথচ তেহরান বলছে, এ অবরোধ প্রত্যাহার না হলে যুদ্ধ অবসানের কোনো চুক্তি বিবেচনাই করা হবে না।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে যে যুদ্ধ শুরু করে, সেটির অবসান নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্যবসায়িক ধাঁচের দ্রুত সমঝোতা করতে পারার সক্ষমতা নিয়ে প্রায়ই গর্ব করা ট্রাম্পের জন্য ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে আলোচনা একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কারণ, তেহরানের কূটনীতিকরা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে অভ্যস্ত, ধীরস্থির এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বাসী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে।
পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অগ্রগতির আশা দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরের কথাও ছিল। কিন্তু ইরান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি এবং শেষ পর্যন্ত ভ্যান্সও সফরে যাননি।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে এবং উপসাগরীয় আরব মিত্ররা সম্ভাব্য নতুন ইরানি হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিতে থাকায় ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান।
তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ইরানের নেতৃত্ব ‘বিভক্ত’ হয়ে পড়েছে এবং নতুন প্রস্তাব তৈরির জন্য তাদের সময় প্রয়োজন।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘ট্রাম্প চাইলে আরও আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারতেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি নিজেকে আরও গভীর সংকটে ফেলেননি।’
সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ট্রাম্পের জন্য এ যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছে। এমনকি তার নিজ দল রিপাবলিকানদের ভেতর থেকেও বিরোধিতা দেখা দিয়েছে।
আক্রমণের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। বিশ্বের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, যা কংগ্রেস নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চাপ তৈরি করেছে।
সব কূটনৈতিক পথ ব্যবহার করতে চান ট্রাম্প
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক, সাবেক ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে নয় এবং তারা আত্মসমর্পণও করবে না।
তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প উত্তেজনা বাড়াতে চান না। আমি বলছি না যে আর উত্তেজনা হবে না, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক সব পথ শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে চাইছেন।’
সিত্রিনোভিচ আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় ট্রাম্প এই যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি বুঝতে পারছেন, যদিও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করছেন না—এ যুদ্ধের মূল্য আরও বাড়বে, কমবে না।’
তবে ইরানের নেতারা ট্রাম্পকে গভীরভাবে অবিশ্বাস করেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা চালানোর মাত্র কয়েকদিন আগেও তার প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। একই ধরনের ঘটনা গত জুনেও ঘটেছিল, যখন আলোচনা চলাকালেই ইসরাইল বোমা হামলা শুরু করে।
ট্রাম্প ও ইরানের শাসকগোষ্ঠী, উভয় পক্ষই নিজেদের দুর্বল দেখানোর বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভাতাঙ্কা বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় নৌ অবরোধ ঘোষণা করে ট্রাম্প নিজেই তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছেন, কেবল ‘কঠোর অবস্থান’ দেখানোর জন্য।
তার মতে, সম্ভাব্য একটি সমাধান হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ বজায় রাখবে, কিন্তু সেটি কঠোরভাবে কার্যকর করবে না।
ভাতাঙ্কা বলেন, ‘ইরান খুব সহজেই বুঝতে পারবে অবরোধ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না।’
এভাবে ইরান একে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। তবে যদি তারা পুরোপুরি অবরোধ প্রত্যাহারের ওপর অনড় থাকে, তাহলে বোঝা যাবে তারা চুক্তির চেয়ে প্রতীকী অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, সেটি ইরানের জন্য ভুল হবে।
অবরোধ কতটা বিস্তৃত হবে?
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প অবরোধ শিথিল করার কোনো ইঙ্গিত দেননি। ইরানে হামলার দীর্ঘদিনের সমর্থক রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, অবরোধই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন যে ‘অবরোধ আরও বিস্তৃত হবে এবং শিগগিরই তা বৈশ্বিক রূপ নিতে পারে।’
প্রগতিশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিনা তুসি বলেন, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়া, যা ইরানকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকার বার্তা দেবে; অথবা অবরোধ বজায় রাখা, যা যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
তিনি বলেন, ‘তেহরানে এখন প্রধান ধারণা হলো সময় তাদের পক্ষেই আছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে।’
সূত্রঃ বাসস