নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর অধিকার। এ লক্ষ্যে সরকার দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের আর্থিক সহায়তার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। মাতৃত্বকালীন ভাতা হলো- দরিদ্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। ২০ বছরের বেশী বয়সের একজন দরিদ্র মা প্রথম এবং দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে ধারণ করলে এই ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ভাতা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মাতৃত্বকালীন ভাতা চালুর ফলে গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে, মা ও শিশুমৃত্যু হ্রাস পাচ্ছে, বাল্য বিবাহের হার কমেছে, বিবাহ নিবন্ধন নিশ্চিত হয়েছে।
একজন সুস্থ মা পারেন একজন সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে। আর একটি সুস্থ সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু জন্মের বিকল্প নেই। সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নানাবিধ কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ হত দরিদ্র নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিটি মা মাতৃত্বকালীন ভাতা হিসাবে প্রতিমাসে ৮০০ টাকা করে পাচ্ছেন। একজন মা ২ বছর পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ভাতা পেয়ে থাকেন। শূন্য থেকে ৫ বছরের মধ্যে শিশুর ৯০ শতাংশ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধিত হয়। তাই এ সময় মা ও শিশুর পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই জরুরি।
আইসিডিডিআরবি’র তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে অপুষ্টিতে ভোগা (বডি মাস ইনডেক্স অনুযায়ী) নারী ছিল ৫০ শতাংশ। বর্তমানে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দশকে নারীর সার্বিক পুষ্টি পরিস্থিতি ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে দেশে এখনও কম ওজন নিয়ে (লো বার্থ ওয়েট) শিশু গ্রহণ করছে। এ পেছনে রয়েছে মায়ের অপুষ্টি। প্রজনন বয়সে এখনো এক তৃতীয়াংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। প্রতি তিনজন নারীর একজন আয়োডিন স্বল্পতার শিকার। মা আয়োডিনের স্বল্পতায় ভুগলে তার প্রভাব পড়ে শিশুর ওপর। আয়োডিন মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায়। ফলে মায়ের ঘাটতির কারণে শিশুর মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না। শুধু দারিদ্র্যই নয়, অসচেতনতা অনেকাংশে দায়ী।
শিশু গর্ভে থাকাকালীন মায়ের শরীর থেকে বেশী পুষ্টি নেয়। এ সময় মায়ের পুষ্টি চাহিদা বাড়ে যায়। মাকে বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ালে মা ও শিশু দু’জনেরই পুষ্টির অভাব দেখা দেবে। এর ফলে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি কম হবে, ওজন কম হবে। কম ওজনের শিশু রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। গর্ভাবস্থায় শিশুর পুষ্টির অভাবে মস্তিষ্ক ঠিকমতো গঠন হয় না। যার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঠিকমতো হয় না। পুষ্টিকর খাবারের অভাবে মায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। মাকে তাই স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ফলমূল, শাকসবজি বেশি করে খাওয়াতে হবে। এ সময় প্রচুর পানি পান করতে হবে।
বাংলাদেশে এখন ১০৭টি মেডিকেল কলেজ, ৫ হাজার ১৮২টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক, প্রায় ১০ হাজার ৪০০ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতাল ৪৬টি, ৪২৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫ লক্ষাধিক স্বাস্থ্যসেবা দানকারী দেশের সব প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে একটি মজবুত ও টেকসই কাঠামোর ওপর দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছে। বর্তমান সরকারের এ সাফল্যকে টেকসই করার জন্য আমাদের প্রত্যেককেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রতিটি মায়ের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে মা ও শিশুকে সু-নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমাদের দেশ থেকে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।
সূত্রঃ বাসস