জাহিদুল ইসলাম, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীর বিস্তীর্ণ বালুচর, যা একসময় ছিল সম্পূর্ণ অনাবাদি ও পরিত্যক্ত, এখন সেখানে গড়ে উঠেছে তরমুজের সবুজ সমারোহ। টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে তরমুজ চাষে বাম্পার ফলন পেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন স্থানীয় কৃষকরা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের সহায়তায় এ অঞ্চলে শুরু হয়েছে এক নতুন কৃষি সম্ভাবনার দুয়ার।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধুধু বালুচরের পর বালুচর জুড়ে সারিবদ্ধ তরমুজ ক্ষেত। সবুজ লতার ফাঁকে ঝুলছে বড় আকারের রসালো তরমুজ। কৃষকদের ব্যস্ততা এখন ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আশ্বিন মাসে বিশেষ পদ্ধতিতে বীজ বপনের মাধ্যমে তরমুজ চাষ শুরু হয় এবং কয়েক মাসের পরিচর্যার পর চৈত্র মাসে পাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত ফলন। এ পুরো প্রক্রিয়ায় উপজেলা কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কিসামতের চরের কৃষক ফজলু মিয়া বলেন, আগে এই জমি একেবারেই অনাবাদি ছিল। এখন তরমুজ চাষ করে ভালো লাভ হচ্ছে। আমাদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে।
একই এলাকার কৃষক সামছুল হক ও কবির হোসেন জানান, বালুর চরে এত ভালো ফলন হবে ভাবিনি। এখন অনেকেই এই চাষে আগ্রহী হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ক্ষেত পরিদর্শন করছে।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজারে ভালো দামের কারণে আগামী মৌসুমে চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বালুচরে মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জমির আর্দ্রতা ধরে রাখা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতির মাধ্যমে কম পানিতে সেচ দিয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে।
ডিমলা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, চরাঞ্চলের কৃষকদের আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছি। তরমুজ চাষে যে সফলতা এসেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে।
স্থানীয়দের মতে, এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি এবং বাজারজাতকরণে কার্যকর সহায়তা জরুরি। এতে চরাঞ্চলের কৃষি আরও সম্প্রসারিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী মৌসুমে তরমুজের পাশাপাশি পেঁপে, মরিচসহ অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
এক সময়ের অনাবাদি তিস্তার বালুচর আজ সম্ভাবনার উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কৃষকদের পরিশ্রম, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে ডিমলার চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে এক অনন্য সবুজ বিপ্লব—যা বদলে দিচ্ছে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র।