যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর থেকেই চরম বৈরী সম্পর্কে জড়িয়ে আছে।
শনিবার ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যার লক্ষ্য এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান ঘটানো। তবে নাজুক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো গভীর।
১৯৭৯: জিম্মি সংকট
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর, অপসারিত সম্রাট মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-এর প্রত্যর্পণের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকারীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের জিম্মি করে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাত মাস পর এ ঘটনা ঘটে।
মোট ৫২ জন জিম্মিকে ৪৪৪ দিন ধরে আটকে রাখা হয়।
১৯৮০ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নয় মাস পর শেষ জিম্মিরা মুক্তি পায়।
২০০২: ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’
১৯৯৫ সালের ৩০ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, দেশটিকে সন্ত্রাসে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ইরান হিজবুল্লাহ, হামাস এবং প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামিক জিহাদসহ আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়।
২০০২ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ হিসেবে আখ্যা দেন।
২০১৯ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করে।
২০১৮: পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানো
২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরানের গোপন পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
২০১১ সালে জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানায়, ইরান অন্তত ২০০৩ সাল পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম চালিয়েছে।
২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে আরোপিত স্থগিতাদেশ তুলে নেন, যদিও তেহরান দাবি করে এটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে।
এক দশক পর ভিয়েনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির নিশ্চয়তা দেয়।
২০২০: শীর্ষ জেনারেল নিহত
২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র বাগদাদে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘তাৎক্ষণিক’ হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।
এর জবাবে ইরান ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
২০২৫: পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা
২০২৫ সালের ২১ জুন ১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি বড় পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
ট্রাম্প দাবি করেন, এসব স্থাপনা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে, যদিও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট নয়।
২০২৬ ফেব্রুয়ারি: খামেনি হত্যা
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমন্বিত হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেি কে হত্যা করে।
এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়।
২০২৬ এপ্রিল: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে আলোচনা
এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদ শহরে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসার কথা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ-এর নেতৃত্বাধীন দলগুলো পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রকাশ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোতে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা, যদি না আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়।
সূত্রঃ বাসস